ব্ল্যাকহোল আসলে কী, এর ভেতরে কী ঘটে

যেখানে আলো পর্যন্ত আটকে যায়, সেই ব্ল্যাকহোল আসলে কী? কীভাবে তৈরি হয়, ভেতরে কী ঘটে—সহজ ভাষায় জেনে নিন মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুর গল্প।

ব্ল্যাকহোল আসলে কী, এর ভেতরে কী ঘটে

মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুটির নাম শুনলেই মনে ভেসে ওঠে এক ভয়ংকর কালো গহ্বরের ছবি, যা চারপাশের সবকিছু গিলে খায়। ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর সত্যিই মহাকাশের এমন এক জায়গা, যেখানকার মহাকর্ষ এত প্রবল যে আলো পর্যন্ত সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। আর আলো বেরোতে পারে না বলেই একে দেখা যায় না, তাই নাম ‘ব্ল্যাক’ হোল।

কিন্তু ব্ল্যাকহোল আসলে কোনো ‘গর্ত’ নয়। চলুন সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি, এই বিস্ময়কর বস্তু আসলে কী এবং এর ভেতরে কী ঘটে।

ব্ল্যাকহোল কীভাবে তৈরি হয়

বেশিরভাগ ব্ল্যাকহোলের জন্ম হয় বিশাল নক্ষত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। আমাদের সূর্যের চেয়ে বহুগুণ বড় কোনো নক্ষত্র যখন তার জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলে, তখন নিজের প্রবল মহাকর্ষের চাপেই সেটি ভেতরের দিকে চুপসে পড়তে থাকে।

এই সংকোচন এতটাই তীব্র হয় যে নক্ষত্রের সমস্ত ভর অবিশ্বাস্য রকম ছোট এক বিন্দুতে জমা হয়ে যায়। ফলে সেখানকার মহাকর্ষ হয়ে ওঠে এতটাই শক্তিশালী যে কাছাকাছি আসা কোনো কিছুই আর ফিরে যেতে পারে না।

ইভেন্ট হরাইজন: ফেরার পথহীন সীমানা

ব্ল্যাকহোলের চারপাশে একটি অদৃশ্য সীমানা থাকে, যাকে বলা হয় ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনাদিগন্ত। এটিকে ভাবতে পারেন এমন এক সীমারেখা হিসেবে, যা একবার পেরিয়ে গেলে আর ফেরার উপায় নেই—এমনকি আলোরও নয়।

এই সীমার বাইরে থাকলে কোনো বস্তু চাইলে দূরে সরে যেতে পারে, কিন্তু একবার ভেতরে ঢুকে গেলে সবকিছু অনিবার্যভাবে কেন্দ্রের দিকে টেনে নেওয়া হয়। আমরা ব্ল্যাকহোলের ভেতরটা ‘দেখতে’ পাই না, কারণ সেখান থেকে কোনো আলো বা তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছায় না।

ভেতরে আসলে কী ঘটে

ইভেন্ট হরাইজন পেরিয়ে ভেতরে কী ঘটে, তা বিজ্ঞানের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নগুলোর একটি। তত্ত্ব অনুযায়ী, কেন্দ্রে থাকে ‘সিঙ্গুলারিটি’—এমন এক বিন্দু, যেখানে সমস্ত ভর জমা হয়ে ঘনত্ব হয়ে ওঠে প্রায় অসীম, আর পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো সেখানে আর কাজ করে না।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি সময় ও স্থান এমনভাবে বেঁকে যায় যে তা আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার বাইরে। কেউ যদি কাল্পনিকভাবে ব্ল্যাকহোলের দিকে পড়তে থাকেন, প্রবল মহাকর্ষীয় টানে তাঁর শরীর লম্বা হয়ে সুতোর মতো হয়ে যেতে পারে—বিজ্ঞানীরা মজা করে একে বলেন ‘স্প্যাগেটিফিকেশন’।

আমরা ব্ল্যাকহোল কীভাবে খুঁজে পাই

ব্ল্যাকহোল নিজে আলো ছড়ায় না, তাহলে বিজ্ঞানীরা একে শনাক্ত করেন কীভাবে? উত্তর হলো—এর প্রভাব দেখে। ব্ল্যাকহোলের প্রবল মহাকর্ষ আশপাশের নক্ষত্র ও গ্যাসকে টেনে নেয়। এই গ্যাস ব্ল্যাকহোলের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে শক্তিশালী রশ্মি ছড়ায়, যা যন্ত্রের সাহায্যে ধরা পড়ে।

২০১৯ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো একটি ব্ল্যাকহোলের ছায়ার ছবি তুলতে সক্ষম হন, যা ছিল এক ঐতিহাসিক অর্জন। এ ছাড়া কাছাকাছি নক্ষত্রের অস্বাভাবিক গতিবিধি দেখেও বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, সেখানে অদৃশ্য কোনো ব্ল্যাকহোল আছে।

শেষ কথা

ব্ল্যাকহোল মহাবিশ্বের সবচেয়ে চরম ও বিস্ময়কর বস্তুগুলোর একটি—যেখানে মহাকর্ষ এত শক্তিশালী যে আলোও বন্দী হয়ে যায়। নক্ষত্রের মৃত্যু থেকে জন্ম, ফেরার পথহীন ইভেন্ট হরাইজন আর কেন্দ্রের রহস্যময় সিঙ্গুলারিটি—এসব মিলিয়ে ব্ল্যাকহোল আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক অমীমাংসিত ধাঁধা। মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমরা যত জানছি, ততই বুঝছি, জানার বাকি আছে আরও অনেক কিছু।

মহাকাশের আর কোন রহস্য নিয়ে জানতে চান? কমেন্টে লিখুন, পরের লেখায় উত্তর খুঁজব।

সূত্র: নাসা ও বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রতিবেদন

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।