১৯ জুন ২০২৬ • ঢাকা আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ নিউজলেটার
সাবস্ক্রাইব
হোম বিজ্ঞান
বিজ্ঞান

জমি ছাড়াই দালানের ভেতরে ফসল, শহরের বুকেই কি হবে কৃষি বিপ্লব

মাটি নেই, খোলা আকাশ নেই, তবু দালানের ভেতরে স্তরে স্তরে ফলছে সবজি। উল্লম্ব চাষ বা ভার্টিক্যাল ফার্মিং কীভাবে কাজ করে, আর জমি-সংকটে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি কতটা সম্ভাবনাময়?

জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক
১৩ মে ২০২৬ • ৪ মিনিট পড়া
Edited with https://edit-online.com

কল্পনা করুন একটি বহুতল ভবন। কিন্তু সেখানে কোনো অফিস নেই, নেই কোনো বসতবাড়ি। বরং প্রতিটি তলায় কৃত্রিম গোলাপি-নীল আলোর নিচে স্তরে স্তরে সাজানো সবুজ লেটুস, পালংশাক আর নানা সবজি। মাটি নেই, রোদ নেই, বৃষ্টিনির্ভরতা নেই—তবু বছরের ৩৬৫ দিন একটানা ফলছে টাটকা ফসল। বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি মনে হলেও এটি এখন সিঙ্গাপুর, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র আর নেদারল্যান্ডসের বাস্তবতা।

এই পদ্ধতির নাম উল্লম্ব চাষ বা ভার্টিক্যাল ফার্মিং। পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছে, অথচ আবাদি জমি কমছে—এই বিপরীতমুখী সংকটের একটি সম্ভাব্য উত্তর হিসেবে এই প্রযুক্তিকে দেখা হচ্ছে। আর যে দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার হেক্টর আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে, সেই বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি নিছক কৌতূহলের নয়, রীতিমতো প্রাসঙ্গিক।

উল্লম্ব চাষ আসলে কী

সাধারণ কৃষিতে আমরা ফসল ফলাই অনুভূমিকভাবে—অর্থাৎ একটি সমতল জমির ওপর ছড়িয়ে। উল্লম্ব চাষে সেই একই ফসল ফলানো হয় উল্লম্বভাবে, একটির ওপর আরেকটি স্তরে—অনেকটা বইয়ের তাকের মতো। ফলে এক টুকরো জমিতে যত ফসল হতো, একই জায়গায় কয়েক গুণ বেশি ফসল ফলানো সম্ভব হয়।

এই চাষে সাধারণত মাটি ব্যবহারই হয় না। গাছের শিকড় ডুবিয়ে রাখা হয় পুষ্টি মেশানো পানিতে—এই পদ্ধতির নাম হাইড্রোপনিক্স। কোথাও আবার শিকড়ে সরাসরি পুষ্টিমিশ্রিত কুয়াশা ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যাকে বলে অ্যারোপনিক্স। সূর্যের বদলে আলো জোগায় বিশেষভাবে তৈরি এলইডি বাতি, যা গাছের সালোকসংশ্লেষণের জন্য ঠিক যতটুকু আলো দরকার, ততটুকুই দেয়।

পুরো পরিবেশটাই থাকে নিয়ন্ত্রণে

উল্লম্ব চাষের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে এর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। এখানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলোর পরিমাণ, এমনকি বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা পর্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাইরের আবহাওয়া যেমনই হোক—তীব্র শীত হোক বা ঝড়বৃষ্টি—ভেতরের ফসলের কিছুই যায়-আসে না।

এর ফলে কয়েকটি বড় সুবিধা মেলে। প্রথমত, আবহাওয়ার ওপর নির্ভরতা না থাকায় সারা বছর একটানা উৎপাদন সম্ভব। দ্বিতীয়ত, বদ্ধ পরিবেশে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম, তাই কীটনাশকের প্রয়োজনই প্রায় ফুরিয়ে যায়। তৃতীয়ত, হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে পানি বারবার ব্যবহার করা হয় বলে সাধারণ চাষের তুলনায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম পানি লাগে। আর যেহেতু ফসল ফলে ক্রেতার শহরেই, তাই দূরদূরান্ত থেকে পরিবহনের খরচ আর সময়ও বেঁচে যায়—টেবিলে পৌঁছায় একেবারে টাটকা সবজি।

তাহলে সব জায়গায় হচ্ছে না কেন

এত সুবিধার পরও উল্লম্ব চাষ এখনো পুরো বিশ্বের কৃষি দখল করে ফেলতে পারেনি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা বিদ্যুৎ খরচ। সূর্যের আলো বিনা মূল্যে পাওয়া যায়, কিন্তু এলইডি বাতি আর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র চালাতে দরকার প্রচুর বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুতের দাম যদি বেশি হয়, তবে উৎপাদিত সবজির দামও বেড়ে যায়।

এ কারণেই উল্লম্ব চাষে এখন পর্যন্ত মূলত দ্রুত বেড়ে ওঠা, হালকা ও দামি ফসলই লাভজনক—যেমন লেটুস, নানা ধরনের শাক, স্ট্রবেরি বা ভেষজ উদ্ভিদ। ধান, গম বা আলুর মতো বিশাল জমিনির্ভর প্রধান ফসল এখনো এই পদ্ধতিতে লাভজনকভাবে ফলানো কঠিন। তবে সৌর বিদ্যুতের দাম কমে আসায় আর প্রযুক্তি সস্তা হওয়ায় এই হিসাব দ্রুত বদলাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় সংকট জমি। প্রতিবছর নগরায়ণ, শিল্পায়ন আর নদীভাঙনে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে, অথচ খাওয়ার মুখ বাড়ছেই। এই বাস্তবতায় কম জায়গায় বেশি ফসল ফলানোর যেকোনো প্রযুক্তিই আমাদের জন্য মূল্যবান।

ঢাকার মতো ঘিঞ্জি শহরে ছাদকৃষি এরই মধ্যে জনপ্রিয়। উল্লম্ব চাষকে এর পরের ধাপ হিসেবে ভাবা যেতে পারে—বিশেষ করে শহরের রেস্তোরাঁ, সুপারশপ বা আবাসিক ভবনের জন্য টাটকা শাকসবজি উৎপাদনে। ছোট পরিসরে হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতি দেশের কিছু উদ্যোক্তা ইতিমধ্যে চালু করেছেন।

তবে বাস্তবতা হলো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ আমাদের জন্য বড়। তাই গোটা দেশের খাদ্যচাহিদা উল্লম্ব চাষে মিটবে—এমন স্বপ্ন এখনই বাস্তব নয়। বরং বাস্তবসম্মত পথ হলো শহরকেন্দ্রিক উচ্চমূল্যের সবজি ও ভেষজ উৎপাদনে এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো, আর সৌর বিদ্যুৎ যুক্ত করে খরচ কমিয়ে আনা।

জমি যখন ফুরিয়ে আসছে, তখন ফসলকে ওপরের দিকে তুলে দেওয়া ছাড়া উপায় কী? পৃথিবী সেই উত্তরই খুঁজছে আকাশের দিকে মুখ তুলে—আর বাংলাদেশের শহরগুলোর ছাদেও হয়তো লুকিয়ে আছে সেই সম্ভাবনার বীজ।

সূত্র: ইউএসডিএ, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও বিভিন্ন কৃষি-প্রযুক্তি প্রতিবেদন
উল্লম্ব চাষ কৃষি খাদ্য নিরাপত্তা
জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক

প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।

সম্পর্কিত লেখা

আকাশ কেন নীল, আর সূর্যাস্ত কেন লাল
বিজ্ঞান

আকাশ কেন নীল, আর সূর্যাস্ত কেন লাল

৩ মিনিট পড়া
পানির ওপর ভেসে থাকা সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশেও কি এভাবে বিদ্যুৎ সম্ভব
বিজ্ঞান

পানির ওপর ভেসে থাকা সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশেও কি এভাবে বিদ্যুৎ সম্ভব

৪ মিনিট পড়া
সাধারণ বালু দিয়ে তৈরি যে ব্যাটারি গোটা শহরকে গরম রাখছে
বিজ্ঞান

সাধারণ বালু দিয়ে তৈরি যে ব্যাটারি গোটা শহরকে গরম রাখছে

৪ মিনিট পড়া

প্রতিদিন নতুন কিছু জানুন

সপ্তাহে একবার, সেরা লেখাগুলো সরাসরি আপনার ইনবক্সে। স্প্যাম নেই।