১৯ জুন ২০২৬ • ঢাকা আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ নিউজলেটার
সাবস্ক্রাইব
হোম বিজ্ঞান
বিজ্ঞান

সাধারণ বালু দিয়ে তৈরি যে ব্যাটারি গোটা শহরকে গরম রাখছে

দামি লিথিয়াম নয়, একদম সাধারণ বালু দিয়েই তৈরি হচ্ছে বিশাল ব্যাটারি, যা মাসের পর মাস তাপ ধরে রাখে। কীভাবে কাজ করে এই সানড ব্যাটারি, আর বাংলাদেশের শিল্পে এর কী সম্ভাবনা?

জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক
১৪ মে ২০২৬ • ৪ মিনিট পড়া
Edited with https://edit-online.com

‘ব্যাটারি’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভাসে মোবাইল বা গাড়ির লিথিয়াম ব্যাটারির ছবি—দামি, দুষ্প্রাপ্য ধাতু দিয়ে তৈরি, আর তৈরির প্রক্রিয়াও পরিবেশের জন্য বেশ ক্ষতিকর। কিন্তু যদি বলি, এমন এক ব্যাটারি বানানো সম্ভব, যার মূল উপাদান একদম সাধারণ বালু—যে বালু নদীর চরে বা নির্মাণস্থলে অবহেলায় পড়ে থাকে?

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ফিনল্যান্ডে এমন ব্যাটারি সত্যি সত্যিই কাজ করছে এবং পুরো একটি জনপদকে শীতের প্রচণ্ড ঠান্ডায় উষ্ণ রাখছে। এই প্রযুক্তির নাম সানড ব্যাটারি বা বালুর ব্যাটারি। নবায়নযোগ্য শক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাটিতেই এটি এক চমকপ্রদ সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সমস্যাটা আসলে কোথায়

সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের একটি বড় মাথাব্যথা হলো, এরা সব সময় বিদ্যুৎ দেয় না। রোদ ঝলমলে দুপুরে বা ঝোড়ো বাতাসে প্রচুর বিদ্যুৎ তৈরি হয়, কিন্তু রাতে বা শান্ত আবহাওয়ায় উৎপাদন কমে যায়। আবার যখন উৎপাদন বেশি অথচ চাহিদা কম, তখন সেই বাড়তি বিদ্যুৎ অনেক সময় নষ্টই হয়ে যায়।

এই বাড়তি বিদ্যুৎ জমিয়ে রাখার স্বাভাবিক উপায় বিশাল লিথিয়াম ব্যাটারি। কিন্তু সেগুলো ভয়ংকর ব্যয়বহুল, এদের আয়ু সীমিত, আর বড় পরিসরে ব্যবহার করতে গেলে খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। ঠিক এখানেই বালুর ব্যাটারির বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল কাজে আসে।

বালুর ব্যাটারি কীভাবে কাজ করে

মূল ধারণাটি আশ্চর্য রকমের সহজ। যখন সৌর বা বায়ু থেকে সস্তায় বাড়তি বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেই বিদ্যুৎ দিয়ে গরম করা হয় বাতাস। সেই গরম বাতাস চালিয়ে দেওয়া হয় একটি বিশাল ইনসুলেটেড ইস্পাতের ট্যাংকে ভরা শত শত টন বালুর ভেতর দিয়ে। ফলে বালু ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় পৌঁছায়।

বালুর সবচেয়ে বড় গুণ হলো, একবার গরম হলে তা দীর্ঘ সময় তাপ ধরে রাখতে পারে—সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস। যখন তাপের দরকার পড়ে, তখন আবার ঠান্ডা বাতাস ওই গরম বালুর ভেতর দিয়ে চালিয়ে নেওয়া হয়; বাতাস উত্তপ্ত হয়ে বেরিয়ে আসে, আর সেই তাপ পাঠিয়ে দেওয়া হয় শহরের ঘরবাড়ি গরম রাখার ডিস্ট্রিক্ট হিটিং ব্যবস্থায়, সাঁতারের পুল কিংবা কারখানার নানা কাজে।

অর্থাৎ এটি বিদ্যুৎকে জমিয়ে রাখে না, বরং বিদ্যুৎকে তাপে রূপান্তরিত করে সেই তাপটাকে জমিয়ে রাখে। আর যেখানে মূল চাহিদাই গরম থাকা (যেমন শীতপ্রধান দেশ), সেখানে এই কৌশল দারুণ কার্যকর।

ফিনল্যান্ডের সেই ব্যাটারি

২০২২ সালে ফিনল্যান্ডের কাঙ্কানপা শহরে পোলার নাইট এনার্জি নামের একটি কোম্পানি বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক বালুর ব্যাটারি চালু করে। প্রায় ১০০ টন বালুভর্তি একটি ইস্পাতের কাঠামোতে তৈরি এই ব্যাটারি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা সাধারণ বালু দিয়েই বানানো। এটি ওই এলাকার একটি ডিস্ট্রিক্ট হিটিং নেটওয়ার্কে যুক্ত, যা ঘরবাড়ি ও একটি সাঁতারের পুল গরম রাখতে সাহায্য করে।

বালুর ব্যাটারির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এর সরলতা ও সস্তা উপাদানে। দামি ধাতু নেই, জটিল রসায়ন নেই, বিস্ফোরণ বা আগুনের ঝুঁকিও নগণ্য। আর বালু তো প্রায় সর্বত্রই সহজলভ্য। এই সাফল্যের পর ফিনল্যান্ডে আরও বড় আকারের প্রকল্প তৈরি হচ্ছে, আর প্রযুক্তিটি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে দুনিয়াজুড়ে।

বাংলাদেশের জন্য এর মানে কী

প্রথমেই একটি সৎ কথা বলে নেওয়া ভালো—বাংলাদেশ গরমের দেশ, এখানে শীতের ঘরবাড়ি গরম রাখার সেই প্রয়োজনই নেই, যার জন্য ফিনল্যান্ডে এই প্রযুক্তি বানানো হয়েছে। তাই হুবহু একই উদ্দেশ্যে এটি আমাদের কাজে লাগবে না।

কিন্তু এর আসল সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়—শিল্পকারখানায়। আমাদের পোশাক, বস্ত্র, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত বা সিরামিক শিল্পে বিপুল পরিমাণ তাপ ও বাষ্পের প্রয়োজন হয়, যা এখন মূলত গ্যাস পুড়িয়ে তৈরি করা হয়। ভবিষ্যতে দিনের সস্তা সৌর বিদ্যুৎ দিয়ে বালুর ব্যাটারিতে তাপ জমিয়ে রেখে সেই তাপ কারখানার কাজে ব্যবহার করা গেলে ব্যয়বহুল গ্যাসনির্ভরতা কমানোর একটি পথ তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে—প্রাথমিক বিনিয়োগ, উপযুক্ত প্রকৌশল আর কারখানার সঙ্গে সমন্বয়। তবে ধারণাটি একেবারে অবাস্তব নয়। ফিনল্যান্ডের এই ছোট্ট ব্যাটারি আসলে বড় একটি বার্তা দিচ্ছে—ভবিষ্যতের শক্তির সমাধান সব সময় দামি আর জটিল প্রযুক্তিতে নয়, কখনো কখনো তা লুকিয়ে থাকে আমাদের পায়ের নিচের সাধারণ বালুর মুঠোতেও।

সূত্র: পোলার নাইট এনার্জি, বিবিসি ও ইন্টারেস্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং
ফিনল্যান্ড বালুর ব্যাটারি শক্তি সংরক্ষণ
জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক

প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।

সম্পর্কিত লেখা

মধু কখনো নষ্ট হয় না কেন
বিজ্ঞান

মধু কখনো নষ্ট হয় না কেন

৩ মিনিট পড়া
ব্ল্যাকহোল আসলে কী, এর ভেতরে কী ঘটে
বিজ্ঞান

ব্ল্যাকহোল আসলে কী, এর ভেতরে কী ঘটে

৩ মিনিট পড়া
ঘুমের সময় আমাদের শরীরে আসলে কী ঘটে
বিজ্ঞান

ঘুমের সময় আমাদের শরীরে আসলে কী ঘটে

৩ মিনিট পড়া

প্রতিদিন নতুন কিছু জানুন

সপ্তাহে একবার, সেরা লেখাগুলো সরাসরি আপনার ইনবক্সে। স্প্যাম নেই।