আকাশ কেন নীল, আর সূর্যাস্ত কেন লাল

দিনের আকাশ নীল, অথচ সূর্যাস্তের সময় তা লাল-কমলা হয়ে ওঠে কেন? আলোর বিচ্ছুরণের সহজ বিজ্ঞান দিয়ে জেনে নিন এই পরিচিত রহস্যের উত্তর।

আকাশ কেন নীল, আর সূর্যাস্ত কেন লাল

মাথার ওপর বিস্তৃত নীল আকাশ আমাদের এতই পরিচিত যে কখনো ভেবেই দেখি না—আকাশটা নীল কেন? আবার সেই একই আকাশ সূর্য ডোবার সময় হঠাৎ লাল, কমলা আর গোলাপি রঙে রঙিন হয়ে ওঠে কীভাবে? মজার ব্যাপার হলো, এই দুটি প্রশ্নের উত্তরই লুকিয়ে আছে একই বিজ্ঞানে—আলোর বিচ্ছুরণ।

চলুন সহজ ভাষায় বুঝে নিই, প্রকৃতির এই রঙের খেলার পেছনের আসল কারণ।

সূর্যের সাদা আলোয় লুকিয়ে আছে সব রং

আমরা সূর্যের আলোকে সাদা মনে করি, কিন্তু আসলে এই সাদা আলো বহু রঙের মিশ্রণ। রংধনুতে আমরা যে সাতটি রং দেখি—বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল—এসবই থাকে সূর্যের আলোয় মিশে।

এই রংগুলোর প্রতিটির তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা। নীল ও বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট, আর লাল ও কমলা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড়। এই পার্থক্যই আকাশের রঙের পুরো গল্পটি লিখে দেয়।

নীল আলো বেশি ছড়িয়ে পড়ে বলেই আকাশ নীল

সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় বাতাসের অসংখ্য ক্ষুদ্র অণুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। এই ধাক্কায় আলো নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে বলে বিচ্ছুরণ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল আলো বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লাল আলোর চেয়ে অনেক বেশি ছড়ায়।

ফলে দিনের বেলা আকাশজুড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এই নীল আলো, আর আমরা যেদিকেই তাকাই, চোখে এসে পৌঁছায় সেই বিচ্ছুরিত নীল। এ কারণেই দিনের আকাশকে নীল দেখায়। (বেগুনি আলো আরও বেশি ছড়ালেও আমাদের চোখ নীলের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, আর কিছু বেগুনি ওপরের বায়ুমণ্ডলেই শোষিত হয়।)

সূর্যাস্তে আকাশ লাল হয় কেন

এবার আসা যাক সূর্যাস্তের রহস্যে। সূর্য যখন আকাশের নিচু দিকে নেমে আসে, তখন তার আলোকে আমাদের চোখে পৌঁছাতে বায়ুমণ্ডলের অনেক বেশি পুরু অংশ পেরিয়ে আসতে হয়। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ছোট তরঙ্গের নীল আলো বেশিরভাগই ছড়িয়ে হারিয়ে যায়।

ফলে আমাদের চোখ পর্যন্ত মূলত পৌঁছায় বড় তরঙ্গের লাল ও কমলা আলো, যা সহজে ছড়ায় না। এ কারণেই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় আকাশ ভরে ওঠে লাল, কমলা আর সোনালি আভায়। বাতাসে ধুলা বা জলকণা বেশি থাকলে এই রং আরও গাঢ় ও নাটকীয় হয়।

মেঘ সাদা দেখায় কেন

একই বিজ্ঞান দিয়ে আরেকটি পরিচিত প্রশ্নেরও উত্তর মেলে—মেঘ সাদা কেন। মেঘের জলকণাগুলো বাতাসের অণুর তুলনায় অনেক বড়। এরা কোনো নির্দিষ্ট রঙকে আলাদা করে না ছড়িয়ে সব রঙকেই প্রায় সমানভাবে বিচ্ছুরিত করে। সব রং একসঙ্গে মিশে গেলে আমরা পাই সাদা, তাই মেঘ সাদা দেখায়।

ঘন বৃষ্টির মেঘ ধূসর বা কালচে দেখানোর কারণ ভিন্ন—এত পুরু মেঘের ভেতর দিয়ে আলো ঠিকমতো বেরোতে পারে না বলেই নিচ থেকে তা অন্ধকার মনে হয়।

শেষ কথা

আকাশের নীল রং বা সূর্যাস্তের লাল আভা—দুটিই আসলে আলোর বিচ্ছুরণের এক চমৎকার খেলা। ছোট তরঙ্গের নীল আলো বেশি ছড়ায় বলে দিনের আকাশ নীল, আর সূর্য নিচে নামলে নীল হারিয়ে গিয়ে থেকে যায় লাল-কমলা। প্রকৃতির সবচেয়ে সাধারণ দৃশ্যের পেছনেও যে কত সূক্ষ্ম বিজ্ঞান লুকিয়ে থাকে, এই রঙের খেলা তারই এক সুন্দর উদাহরণ।

প্রকৃতির আর কোন রহস্য আপনাকে ভাবায়? কমেন্টে জানান।

সূত্র: নাসা ও বিভিন্ন পদার্থবিজ্ঞান প্রতিবেদন

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।