১৯ জুন ২০২৬ • ঢাকা আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ নিউজলেটার
সাবস্ক্রাইব
হোম বিজ্ঞান
বিজ্ঞান

পানির ওপর ভেসে থাকা সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশেও কি এভাবে বিদ্যুৎ সম্ভব

জমির অভাবে যখন সৌর বিদ্যুৎ থমকে যাচ্ছে, তখন পৃথিবী খুঁজে নিচ্ছে পানির ওপর ভাসমান সৌর প্যানেলের পথ। কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি, আর নদীমাতৃক বাংলাদেশেই বা এর সম্ভাবনা কতটা?

জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক
১৩ মে ২০২৬ • ৪ মিনিট পড়া
Edited with https://edit-online.com

সৌর বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় শত্রু কে জানেন? সূর্য নয়, মেঘও নয়—জমি। একটি বড় সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাতে যে বিশাল খোলা জায়গা দরকার, ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে সেই জমিই সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য। যে জমিতে সোলার প্যানেল বসবে, সেখানে তো ফসলও ফলানো যেত, ঘরবাড়িও তোলা যেত।

ঠিক এই সমস্যার একটি অভিনব সমাধান নিয়ে কাজ করছে পৃথিবীর অনেক দেশ—সোলার প্যানেলগুলোকে জমি থেকে তুলে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে পানির ওপর। হ্রদ, জলাধার, পরিত্যক্ত খনির পুকুর কিংবা এমনকি সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকছে সারি সারি সৌর প্যানেল। প্রযুক্তিটির নাম ফ্লোটিং সোলার বা ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য এ যেন প্রকৃতিরই দেওয়া এক সম্ভাবনা।

ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ আসলে কী

ধারণাটি শুনতে যতটা জটিল, আসলে ততটা নয়। সাধারণ সৌর প্যানেলগুলোকেই বিশেষভাবে তৈরি একধরনের প্লাস্টিকের ভাসমান কাঠামো বা পন্টুনের ওপর বসানো হয়। এই কাঠামো পানিতে ভেসে থাকে, ঠিক যেমন ভেসে থাকে একটি নৌকা। নিচে নোঙরের সাহায্যে পুরো ব্যবস্থাটিকে এমনভাবে আটকে রাখা হয়, যাতে স্রোত বা বাতাসে তা ভেসে না যায়।

প্যানেল থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ পানির নিচ দিয়ে বা ভাসমান তারের মাধ্যমে তীরে এনে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়। কাজের মূল নীতি সাধারণ সোলার প্যানেলের মতোই—সূর্যের আলো থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ তৈরি। শুধু বসানোর জায়গাটাই কেবল জমির বদলে পানি।

জমি বাঁচানো ছাড়াও বাড়তি যেসব সুবিধা

ভাসমান সৌর বিদ্যুতের সবচেয়ে স্পষ্ট সুবিধা হলো মূল্যবান জমি একটুও খরচ না করা। কিন্তু চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, পানির ওপর বসানোর কারণে এই প্যানেলগুলো জমিতে বসানো প্যানেলের চেয়ে আরও কিছু বাড়তি সুবিধা পায়।

সোলার প্যানেল গরম হয়ে গেলে এর কর্মক্ষমতা কমে যায়—এটি একটি পরিচিত সমস্যা। পানির ওপর থাকায় প্যানেলের নিচের ঠান্ডা পানি প্রাকৃতিকভাবেই প্যানেলকে শীতল রাখে। ফলে একই প্যানেল জমির তুলনায় পানির ওপর কিছুটা বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

আবার প্যানেলগুলো পানির উপরিভাগ ঢেকে রাখায় সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে উবে যাওয়ার পরিমাণ কমে যায়। শুষ্ক অঞ্চলে কিংবা পানি সংরক্ষণের জলাধারে এটি বিরাট সুবিধা—একদিকে বিদ্যুৎ, অন্যদিকে পানির অপচয় রোধ। প্যানেলের ছায়ায় শৈবালের অতিরিক্ত জন্ম কমে গিয়ে পানির গুণমানও অনেক সময় ভালো থাকে।

পৃথিবীজুড়ে কত দূর এগিয়েছে এই প্রযুক্তি

ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ এখন আর পরীক্ষাগারের বিষয় নয়, রীতিমতো বাণিজ্যিক বাস্তবতা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে চীন। দেশটির বিশাল ভাসমান সৌর প্রকল্পগুলোর কোনো কোনোটির উৎপাদনক্ষমতা ৬৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত, আয়তনে যা শত শত ফুটবল মাঠের সমান। অনেক প্রকল্প গড়ে উঠেছে পরিত্যক্ত কয়লাখনির জমে থাকা পানির ওপর—যে জায়গা একসময় ছিল পরিবেশ ধ্বংসের প্রতীক, আজ সেখানেই তৈরি হচ্ছে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ।

ভারতের মধ্যপ্রদেশে ওমকারেশ্বর জলাধারে তৈরি হচ্ছে বিশাল ভাসমান সৌর প্রকল্প। দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সেমানগিউম উপকূলে গড়ে তুলছে গিগাওয়াট মাত্রার বিশাল প্রকল্প। সম্প্রতি তাইওয়ান সমুদ্রের বুকে স্থাপন করেছে এমন এক প্রকল্প, যা থেকে কয়েক লাখ পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অর্থাৎ স্বাদুপানি থেকে শুরু করে নোনা সমুদ্র—সবখানেই এই প্রযুক্তি এখন কাজ করছে।

কিছু চ্যালেঞ্জও আছে

সব ভালোর সঙ্গে কিছু কঠিন বাস্তবতাও জড়িয়ে থাকে। ভাসমান সৌর কাঠামোর প্রাথমিক খরচ জমিতে বসানো প্যানেলের চেয়ে বেশি, কারণ পানিরোধী ভাসমান কাঠামো, নোঙর আর পানির নিচ দিয়ে যাওয়া তার—সবই বাড়তি প্রকৌশল দাবি করে।

লবণাক্ত পানিতে ক্ষয়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে কাঠামোর ক্ষতি, কিংবা জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব—এসবও বিবেচনায় রাখতে হয়। তাই বড় পরিসরে যাওয়ার আগে স্থানীয় পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই নকশা তৈরি করাই আসল কাজ।

বাংলাদেশেও কি এভাবে বিদ্যুৎ সম্ভব

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর—সম্ভাবনা বিপুল। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর পানি। অসংখ্য নদী, হাওর, বিল, পুকুর আর বিশাল কাপ্তাই হ্রদ—ভাসমান সৌর বিদ্যুতের জন্য এ যেন আদর্শ ভৌগোলিক অবস্থা। যে দেশে নতুন সৌরকেন্দ্রের জন্য সমতল জমি পাওয়াই কঠিন, সেখানে পানির এই বিশাল উন্মুক্ত পৃষ্ঠ এক বিরাট সুযোগ।

বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদের মতো বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন জলাধার, যেখানে গ্রিড-সংযোগ আগে থেকেই আছে, সেখানে ভাসমান সৌর প্যানেল বসিয়ে অল্প খরচেই বাড়তি বিদ্যুৎ যোগ করা যেতে পারে। সেচ প্রকল্পের জলাধার, শিল্প এলাকার বর্জ্য-পুকুর কিংবা উপকূলীয় চিংড়িঘেরের ওপরও এই প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সম্ভাবনা আছে।

তবে বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি বিষয় ভাবতেই হবে। বর্ষায় হঠাৎ পানির উচ্চতার বড় হেরফের, ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিশালী বাতাস আর প্রাথমিক বিনিয়োগের খরচ—এ তিনটিই মূল চ্যালেঞ্জ। ছোট পরিসরে পাইলট প্রকল্প চালিয়ে স্থানীয় পরিস্থিতিতে এর কার্যকারিতা যাচাই করেই বড় বিনিয়োগে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

বিশ্ব যখন জমির সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আকাশের আলোকে পানির বুকে ধরে রাখার পথ খুঁজছে, তখন নদীমাতৃক বাংলাদেশের হাতে রয়েছে সেই পথের সবচেয়ে বড় কাঁচামাল—অফুরন্ত পানি আর অফুরন্ত রোদ। প্রয়োজন শুধু সাহসী পরিকল্পনা আর সঠিক বিনিয়োগের।

সূত্র: পাওয়ার-টেকনোলজি, পিভি ম্যাগাজিন ও ইন্টারেস্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং
নবায়নযোগ্য শক্তি বাংলাদেশ ভাসমান সৌর সৌর বিদ্যুৎ
জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক

প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।

সম্পর্কিত লেখা

জমি ছাড়াই দালানের ভেতরে ফসল, শহরের বুকেই কি হবে কৃষি বিপ্লব
বিজ্ঞান

জমি ছাড়াই দালানের ভেতরে ফসল, শহরের বুকেই কি হবে কৃষি বিপ্লব

৪ মিনিট পড়া
রাতের সমুদ্র কেন হঠাৎ নীল আলোয় জ্বলে ওঠে, কক্সবাজারেও কি দেখা সম্ভব
বিজ্ঞান

রাতের সমুদ্র কেন হঠাৎ নীল আলোয় জ্বলে ওঠে, কক্সবাজারেও কি দেখা সম্ভব

৪ মিনিট পড়া
সাধারণ বালু দিয়ে তৈরি যে ব্যাটারি গোটা শহরকে গরম রাখছে
বিজ্ঞান

সাধারণ বালু দিয়ে তৈরি যে ব্যাটারি গোটা শহরকে গরম রাখছে

৪ মিনিট পড়া

প্রতিদিন নতুন কিছু জানুন

সপ্তাহে একবার, সেরা লেখাগুলো সরাসরি আপনার ইনবক্সে। স্প্যাম নেই।