রাতের সমুদ্র কেন হঠাৎ নীল আলোয় জ্বলে ওঠে, কক্সবাজারেও কি দেখা সম্ভব
রাতের ঢেউয়ে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে নীলচে আলোর ঝিলিক। এই আলো কোনো জাদু নয়, বরং অসংখ্য অণুজীবের রসায়ন। কীভাবে জ্বলে ওঠে সমুদ্র, আর বাংলাদেশের উপকূলেও কি এমন দৃশ্য সম্ভব?
ঘন অন্ধকার রাত। সৈকতে আছড়ে পড়ছে একের পর এক ঢেউ। হঠাৎ চোখে পড়ে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য—প্রতিটি ঢেউ ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে পানির ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে নীলচে-সবুজ আলোর ঝিলিক। পায়ের নিচে ভেজা বালুতে পা ফেললেও জ্বলে উঠছে আলো, যেন কেউ সমুদ্রের বুকে অসংখ্য নীল তারা ছড়িয়ে দিয়েছে। ছবিতে এই দৃশ্য নিশ্চয়ই দেখেছেন। কিন্তু কখনো ভেবেছেন, পানি নিজে থেকে আলো জ্বালে কীভাবে?
এই রহস্যময় আলো কোনো জাদু বা কল্পনা নয়। এর পেছনে আছে প্রকৃতির সবচেয়ে চমকপ্রদ একটি কৌশল—জীবন্ত প্রাণীর শরীরে তৈরি হওয়া আলো, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় বায়োলুমিনিসেন্স।
আলোটা আসছে কোথা থেকে
রাতের সমুদ্রের এই নীল আলোর পেছনের নায়ক চোখেই দেখা যায় না। এরা হলো ডাইনোফ্ল্যাজেলেট নামের একধরনের আণুবীক্ষণিক সামুদ্রিক প্ল্যাঙ্কটন। এক ফোঁটা পানিতেই থাকতে পারে এমন হাজার হাজার অণুজীব। যখন এদের সংখ্যা প্রচুর বেড়ে যায়, তখনই গোটা সৈকত আলোয় ঝলমল করে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সবচেয়ে পরিচিত প্রজাতিগুলোর একটির নাম নকটিলুকা সিনটিল্যান্স, যাকে আদর করে অনেকে ‘সি স্পার্কল’ বা সমুদ্রের জোনাকি বলেও ডাকে। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের অঞ্চলে এই প্রজাতির উপস্থিতি বেশ পরিচিত।
শরীরের ভেতরে কীভাবে তৈরি হয় এই আলো
এই আলো তৈরির রসায়নটা সত্যিই বিস্ময়কর। ডাইনোফ্ল্যাজেলেটের শরীরে থাকে লুসিফেরিন নামের একটি বিশেষ যৌগ এবং লুসিফারেজ নামের একটি উৎসেচক বা এনজাইম। যখন এই দুটি উপাদান অক্সিজেনের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া করে, তখন তৈরি হয় আলো। মজার ব্যাপার হলো, এই আলোয় তাপ প্রায় থাকেই না—তাই একে বলা হয় ‘ঠান্ডা আলো’। সাধারণ বাল্ব যেখানে শক্তির বড় অংশ তাপ হিসেবে নষ্ট করে, এই প্রাকৃতিক আলো সেখানে প্রায় পুরো শক্তিকেই আলোয় রূপান্তর করতে পারে।
এই অণুজীবের শরীরে ছোট ছোট থলির মতো অংশ থাকে, নাম সিনটিলন। আলো তৈরির পুরো বিক্রিয়াটি ঘটে এই থলিগুলোর ভেতরেই।
ঢেউ ভাঙলেই কেন জ্বলে ওঠে
প্রশ্ন হলো, ডাইনোফ্ল্যাজেলেট সারাক্ষণই তো পানিতে আছে, তবে আলো শুধু ঢেউ ভাঙার সময় বা পানি নাড়ালেই কেন দেখা যায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এক চমৎকার প্রতিরক্ষাকৌশলে।
এই অণুজীবেরা আলো জ্বালায় তখনই, যখন তারা কোনো ধাক্কা বা চাপ অনুভব করে—যেমন ঢেউ ভাঙা, নৌকার বইঠার নাড়া কিংবা মানুষের পায়ের চাপ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আকস্মিক এই আলোর ঝলকানি আসলে শিকারিকে চমকে দেওয়ার বা ভয় দেখানোর একটি কৌশল। কেউ কেউ মনে করেন, আলো জ্বেলে এরা নিজেদের শিকারিকেও আবার বড় শিকারির নজরে এনে দেয়—অনেকটা ‘চোর ধরিয়ে দেওয়ার’ মতো। তাই পানি যত নড়াচড়া করে, আলো তত স্পষ্ট হয়।
এই আলো কি সব সময় ভালো লক্ষণ
এমন মোহনীয় দৃশ্যের পেছনে একটি সতর্কবার্তাও লুকিয়ে থাকতে পারে। যখন নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে হঠাৎ এই অণুজীবের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়, তখন একে বলা হয় অ্যালগাল ব্লুম। নকটিলুকা সিনটিল্যান্সের অতিরিক্ত বিস্তার অনেক সময় পানির অক্সিজেন কমিয়ে দিয়ে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও দূষণের সঙ্গেও এই ঘটনার যোগ আছে বলে গবেষকেরা মনে করেন। অর্থাৎ চোখের জন্য যা সুন্দর, পরিবেশের জন্য তা সব সময় ততটা নিরীহ না-ও হতে পারে।
কক্সবাজার বা সেন্ট মার্টিনেও কি দেখা সম্ভব
বাংলাদেশের উপকূল বঙ্গোপসাগরের অংশ, আর এ অঞ্চলে বায়োলুমিনিসেন্স ঘটানো অণুজীবের উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। বিভিন্ন সময়ে কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন উপকূলে রাতের ঢেউয়ে নীলচে আভা দেখা যাওয়ার কথা পর্যটক ও স্থানীয়দের মুখে শোনা গেছে। অর্থাৎ তত্ত্বগতভাবে এমন দৃশ্য আমাদের সৈকতেও সম্ভব।
তবে এটি ঘটে একেবারে নির্দিষ্ট কিছু শর্তে। দরকার গভীর অন্ধকার রাত, যত কম সম্ভব কৃত্রিম আলো, চাঁদের আলো না থাকা আর ওই নির্দিষ্ট অণুজীবের যথেষ্ট উপস্থিতি। শহুরে আলোকদূষণ থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, এই আলো দেখার সম্ভাবনা তত বাড়ে। এ কারণেই কক্সবাজারের মূল ভিড়ের সৈকতের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নির্জন উপকূলে এর দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
পরের বার রাতের সৈকতে দাঁড়িয়ে যদি কখনো ঢেউয়ের ভেতর নীল আলোর ঝিলিক দেখেন, মনে রাখবেন—আপনি আসলে চোখের সামনে দেখছেন কোটি কোটি ক্ষুদ্র প্রাণের একসঙ্গে জ্বলে ওঠা এক জীবন্ত আলোকসজ্জা। প্রকৃতির সবচেয়ে নিঃশব্দ অথচ সবচেয়ে বিস্ময়কর আয়োজনগুলোর একটি এটি।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, কেমিস্ট্রি ওয়ার্ল্ড ও বিভিন্ন সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান প্রতিবেদন
প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।



