উট কুঁজে পানি জমায় না—তাহলে মরুভূমিতে টেকে কীভাবে
উটের কুঁজে পানি নয়, জমে থাকে চর্বি। তাহলে পানি ছাড়া দিনের পর দিন মরুভূমিতে উট টিকে থাকে কীভাবে? জেনে নিন আসল কৌশলগুলো।
উটকে বলা হয় মরুভূমির জাহাজ। বালির সমুদ্রে দিনের পর দিন হাঁটে, মাথার ওপর আগুনঝরা রোদ, চারপাশে পানির চিহ্নমাত্র নেই—তবু সে দিব্যি চলতে থাকে। ছোটবেলা থেকে আমরা এর একটাই ব্যাখ্যা শুনে এসেছি: উট তার কুঁজের ভেতরে পানি জমিয়ে রাখে, দরকারমতো একটু একটু করে খরচ করে। ব্যাখ্যাটা এত সহজ আর এত পুরোনো যে একে সন্দেহ করার কথা আমাদের মাথাতেই আসে না।
অথচ সত্যিটা হলো, উটের কুঁজের ভেতরে এক ফোঁটাও জমানো পানি নেই। সেখানে যা আছে, তা পানি নয়—চর্বি। তাহলে পানি না জমিয়ে দিনের পর দিন এই প্রাণীটি টিকে থাকে কীভাবে? আসল উত্তরটা কুঁজের গল্পের চেয়েও অনেক বেশি চমকপ্রদ, আর সেখানে জড়িয়ে আছে উটের গোটা শরীরের গড়নই।
কুঁজের ভেতরে আসলে কী জমা থাকে
উটের কুঁজ মূলত চর্বির একটি বড় স্তূপ—শরীরের জমানো শক্তির ভাণ্ডার। খাবার আর পানি যখন পর্যাপ্ত, তখন কুঁজ ভরাট, টানটান আর শক্ত হয়ে থাকে। কিন্তু দিনের পর দিন খাবার না জুটলে শরীর সেই চর্বি ভাঙতে শুরু করে, কুঁজ তখন ছোট হয়ে আসে, নরম হয়ে একদিকে হেলে পড়ে বা ঝুলে যায়। মরুভূমির অভিজ্ঞ মানুষেরা তাই উটের কুঁজের চেহারা দেখেই আন্দাজ করে নেন, প্রাণীটি কত দিন ধরে কষ্টে আছে।
তাহলে পানির গল্পটা এল কোথা থেকে? চর্বি পোড়ালে শক্তির সঙ্গে কিছুটা পানিও তৈরি হয়—এটি শরীরের রাসায়নিক প্রক্রিয়ারই স্বাভাবিক ফল। সম্ভবত এখান থেকেই ধারণাটি ডালপালা মেলেছে। কিন্তু একে উটের পানির ভাণ্ডার বলা চলে না। কারণ চর্বি পোড়াতে গেলে বাড়তি অক্সিজেন লাগে, ফলে নিঃশ্বাস চলে দ্রুত, আর প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে জলীয় বাষ্প হয়ে শরীর থেকে পানি বেরিয়েও যায়। হিসাব মিলিয়ে দেখলে লাভটা খুব বড় কিছু নয়।
অর্থাৎ উটের আসল কৃতিত্ব পানি জমানোয় নয়, পানি খরচ না করায়। ঠিক এখানেই তার শরীর অন্য প্রাণীদের চেয়ে আলাদা।
চর্বি এক জায়গায় জড়ো করে রাখার লাভ কোথায়
বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীর চর্বি সারা শরীরের চামড়ার নিচে ছড়ানো থাকে। ঠান্ডা দেশের প্রাণীদের জন্য এটি দারুণ—চর্বির ওই স্তর কম্বলের মতো তাপ আটকে রাখে। কিন্তু মরুভূমিতে সমস্যা ঠিক উল্টো। সেখানে দরকার শরীরের ভেতরের তাপ দ্রুত বাইরে ছেড়ে দেওয়া, আর সারা গায়ে ছড়ানো চর্বি সেই কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
উট এই সমস্যার সমাধান করেছে চর্বিটা এক জায়গায় জড়ো করে। পিঠের ওপর কুঁজে চর্বি জমা থাকায় শরীরের বাকি অংশ তুলনামূলক পাতলা থাকে, ফলে ভেতরের তাপ চামড়া দিয়ে সহজে বেরিয়ে যেতে পারে। বাড়তি হিসেবে কুঁজটি ঠিক ওপরের দিকে থাকায় দিনের সবচেয়ে চড়া রোদটা প্রথমে সেখানেই পড়ে, শরীরের বাকি অংশে তাপের চাপ কিছুটা কম পড়ে বলে মনে করা হয়।
উটের লম্বা পা-ও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। মরুভূমির বালি দিনের বেলায় ভয়ানক গরম হয়ে ওঠে, আর লম্বা পায়ের কারণে উটের শরীর সেই তেতে ওঠা বালি থেকে বেশ খানিকটা ওপরে থাকে। সেখানে বাতাস তুলনামূলক ঠান্ডা, চলাচলও বেশি।
শরীরকে গরম হতে দেওয়াই যেভাবে পানি বাঁচায়
আমাদের শরীর তাপমাত্রা প্রায় স্থির রাখতে চায়। একটু বাড়লেই ঘাম ঝরিয়ে সেটিকে নামিয়ে আনে, আর ঘাম মানেই পানি খরচ। উট এই জায়গায় সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটে। দিনের বেলায় সে শরীরের তাপমাত্রা বেশ খানিকটা বাড়তে দেয়, ঘাম ঝরিয়ে তাড়াহুড়ো করে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে না।
রাতে যখন মরুভূমি ঠান্ডা হয়ে আসে, উটের শরীরও ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যায়। ভোরে সে দিন শুরু করে বেশ কম তাপমাত্রা নিয়ে, ফলে দিনের পুরো তাপটা শুষে নেওয়ার মতো অনেকখানি জায়গা তার শরীরে থাকে। দুপুরের রোদে ধীরে ধীরে সেই তাপ জমতে থাকে, আর ঘাম ঝরানোর দরকারই পড়ে না। সঞ্চয়টা হয় পানির।
উট ঘামেও অনেক দেরিতে এবং অনেক কম। তার গায়ের ঘন লোম দেখে গরমে অস্বস্তিকর মনে হলেও এই লোম আসলে সরাসরি রোদ আটকে দেয় এবং চামড়ার ঠিক ওপরে একটি অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বাতাসের স্তর ধরে রাখে। লোম ছেঁটে ফেললে উটকে বরং বেশি ঘামতে হয়।
নিঃশ্বাস, প্রস্রাব আর মল—তিন জায়গাতেই কড়া হিসাব
শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায় মূলত তিন পথে—নিঃশ্বাস, প্রস্রাব আর মল। উট এই তিন জায়গাতেই অসাধারণ কৃপণ। তার নাকের ভেতরের পথ প্যাঁচানো ও ঠান্ডা; শ্বাস ছাড়ার সময় গরম, ভেজা বাতাস সেই ঠান্ডা দেয়ালে লেগে জলীয় বাষ্পের অনেকটাই ফোঁটা হয়ে জমে যায় এবং শরীরে ফিরে যায়। আমরা ঠান্ডা দিনে মুখের সামনে যে সাদা ধোঁয়া দেখি, উটের নাক সেই পানিটুকু বাইরে যেতেই দেয় না।
কিডনিও একইভাবে কৃপণ। উটের প্রস্রাব খুব ঘন ও অল্প পরিমাণে হয়—শরীরের বর্জ্য বের করে দিতে যতটুকু পানি একেবারেই লাগে, ততটুকুই খরচ হয়। অন্ত্রের কাজও একই রকম; খাবারের অবশিষ্ট থেকে পানির শেষ বিন্দুটুকু টেনে নেওয়ার পর যা পড়ে থাকে, তা প্রায় শুকনো। মরুভূমির মানুষ যুগ যুগ ধরে উটের এই শুকনো মল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন, কারণ তা শুকাতে আলাদা করে সময়ই লাগে না।
রক্ত যেভাবে ধাক্কা সামলায়, আর একবারে বিপুল পানি পান
পানিশূন্যতা শুরু হলে বেশির ভাগ প্রাণীর বিপদ বাড়ে রক্ত ঘন হয়ে যাওয়ার কারণে। ঘন রক্ত সরু শিরা-ধমনির ভেতর দিয়ে সহজে চলতে চায় না, হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ বাড়ে। উটের লোহিত রক্তকণিকা এই জায়গায় আলাদা—অন্য স্তন্যপায়ীদের মতো গোল না হয়ে সেগুলো অনেকটা ডিম্বাকৃতির এবং বেশ নমনীয়। রক্ত ঘন হয়ে এলেও এই কণিকাগুলো সরু পথ দিয়ে গড়িয়ে চলতে পারে।
আসল খেলাটা দেখা যায় পানি পাওয়ার পর। বহুদিনের তেষ্টা নিয়ে জলাশয়ের সামনে দাঁড়ানো উট কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পানি খেয়ে ফেলতে পারে। মানুষের শরীরে হঠাৎ এত পানি ঢুকলে রক্ত পাতলা হয়ে গিয়ে বিপদ ঘটতে পারে, লোহিত কণিকাগুলো পানি টেনে ফুলে ফেটে যেতে পারে। উটের কণিকার দেয়াল এতটাই নমনীয় যে সেগুলো ফুলে ওঠে ঠিকই, কিন্তু ফাটে না। শরীরও ধীরে ধীরে সেই পানি সব কোষে ছড়িয়ে দেয়।
এই সব কৌশল একসঙ্গে কাজ করে বলেই উট শরীরের পানির একটা বড় অংশ হারিয়ে ফেলার পরও হাঁটতে পারে, যে অবস্থায় অন্য অনেক প্রাণী অনেক আগেই কাবু হয়ে পড়ত।
শেষ কথা
উটের কুঁজে পানি নেই—এই তথ্যটা প্রথমে শুনতে খারাপ লাগতে পারে, ছোটবেলার একটা সুন্দর গল্প ভেঙে যায় বলে। কিন্তু আসল ব্যাখ্যাটা জানার পর মনে হয়, প্রকৃতি গল্পটাকে আরও অনেক দূর নিয়ে গেছে। পানি জমিয়ে রাখার সহজ সমাধানের বদলে উটের শরীর বেছে নিয়েছে অনেকগুলো ছোট ছোট কৌশল—তাপ সামলানো, ঘাম আটকানো, নিঃশ্বাসের পানি ফিরিয়ে নেওয়া, রক্তকে টিকিয়ে রাখা।
পরের বার কোথাও উটের ছবি দেখলে বা চিড়িয়াখানায় সামনাসামনি পড়লে কুঁজটার দিকে তাকিয়ে মনে পড়তে পারে—ওটি পানির টাংকি নয়, শক্তির ভাণ্ডার। আর মরুভূমিতে টিকে থাকার আসল রহস্যটা লুকিয়ে আছে গোটা শরীরজুড়ে।
ছোটবেলায় শেখা এমন আর কোন তথ্য পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে বলে আপনার মনে পড়ে? কমেন্টে লিখুন।
সূত্র: বিভিন্ন প্রাণিবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান সাময়িকীর প্রতিবেদন
প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।



