১৬ অক্টোবর ২০২৬ • ঢাকা আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ নিউজলেটার
সাবস্ক্রাইব
হোম ›বিজ্ঞান
বিজ্ঞান

সুন্দরবনের গাছ লবণপানিতে বাঁচে কীভাবে

লবণপানিতে সাধারণ গাছ মরে যায়, অথচ সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ দিব্যি বেঁচে থাকে। শিকড়, পাতা আর চারা—তিন জায়গায় লুকানো কৌশলগুলো জেনে নিন।

জ
জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • ৭ মিনিট পড়া
সুন্দরবনের কাদায় জেগে থাকা শ্বাসমূল

বাড়ির টবের গাছে ভুল করে একটু লবণপানি ঢেলে দিলে কী হয়, অনেকেরই জানা—দু-এক দিনের মধ্যেই পাতা নেতিয়ে পড়ে, তারপর গাছটাই শুকিয়ে যায়। অথচ বাংলাদেশের দক্ষিণে বিশাল এক বন দাঁড়িয়ে আছে ঠিক এমন জায়গায়, যেখানে দিনে দুবার জোয়ারের লোনা পানি এসে গাছের গোড়া ডুবিয়ে দিয়ে যায়। মাটি সেখানে থকথকে কাদা, পানিতে লবণের স্বাদ, আর তার মধ্যেই ঘন সবুজ হয়ে বেঁচে আছে সুন্দরবন।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বন কেবল টিকেই নেই, রীতিমতো জমজমাট—বাঘ, হরিণ, কুমির, অসংখ্য পাখি আর লাখো মানুষের জীবিকা এই বনকে ঘিরে। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক: যে পানিতে সাধারণ গাছ কয়েক দিনও টেকে না, সেই পানিতে সুন্দরী, গেওয়া বা কেওড়া গাছ বছরের পর বছর বেঁচে থাকে কীভাবে? উত্তরটা একটিমাত্র কৌশলে নয়, লুকিয়ে আছে শিকড় থেকে পাতা পর্যন্ত গোটা গাছের গড়নে।

লবণপানি গাছের জন্য কেন এত বড় বিপদ

গাছ পানি টানে শিকড় দিয়ে, আর সেই টানের পেছনে কাজ করে একটি সহজ নিয়ম—পানি সব সময় কম লবণের দিক থেকে বেশি লবণের দিকে যেতে চায়। সাধারণ মাটিতে গাছের কোষের ভেতরটা বাইরের পানির চেয়ে ঘন হয়, তাই পানি আপনা থেকেই শিকড়ের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

লোনা মাটিতে হিসাবটা উল্টে যায়। বাইরের পানিতে লবণ এত বেশি থাকে যে পানি আর ভেতরে ঢুকতে চায় না, উল্টো শিকড়ের ভেতরের পানি বেরিয়ে আসতে চায়। ফলে চারপাশে থইথই পানি থাকা সত্ত্বেও গাছ কার্যত তেষ্টায় ভুগতে থাকে। তার ওপর যতটুকু লবণ শরীরে ঢুকে পড়ে, তা জমতে জমতে পাতার কোষের কাজ নষ্ট করে দেয়।

ম্যানগ্রোভ গাছেরা এই দুটি সমস্যাকেই আলাদা করে সামলায়। এক দিকে তারা কোষের ভেতরে বিশেষ কিছু উপাদান জমিয়ে রেখে পানি টানার ক্ষমতা ধরে রাখে, অন্য দিকে ভেতরে ঢুকে পড়া লবণটাকে নানা কৌশলে বিদায় করে দেয়।

লবণ ঠেকাতে ম্যানগ্রোভের তিন কৌশল

প্রথম কৌশলটি কাজ করে একেবারে শুরুতেই, শিকড়ে। ম্যানগ্রোভের শিকড়ের দেয়াল এমনভাবে গড়া যে তা ছাঁকনির মতো কাজ করে—পানি ভেতরে ঢুকতে দেয়, কিন্তু লবণের বড় অংশটা বাইরেই আটকে রাখে। সুন্দরী গাছ মূলত এই পথেই চলে; লবণকে সে শরীরে ঢুকতেই দিতে চায় না। এ কারণেই সুন্দরী গাছ তুলনামূলক কম লবণাক্ত এলাকায় ভালো জন্মায়, আর লবণ বেড়ে গেলে সবার আগে বিপদে পড়ে।

দ্বিতীয় কৌশলটি বেশ চমকপ্রদ—লবণ শরীরে ঢুকলে গাছ সেটিকে পাতার গায়ে বিশেষ কিছু গ্রন্থির মাধ্যমে বাইরে বের করে দেয়। বাইন গাছের পাতায় হাত বোলালে অনেক সময় খসখসে দানা টের পাওয়া যায়, রোদে শুকিয়ে যাওয়া লবণের সাদাটে গুঁড়ো চোখেও পড়ে। বৃষ্টি এলে সেই লবণ ধুয়ে যায়, গাছ আবার নতুন করে লবণ বের করতে শুরু করে।

তৃতীয় কৌশলটি ধৈর্যের—গাছ লবণকে জমা করতে থাকে কিছু নির্দিষ্ট পুরোনো পাতায়, তারপর সেই পাতাগুলো ঝরিয়ে দেয়। গেওয়া গাছের পাতা ঝরার আগে যে লালচে রং ধরে, তা এই প্রক্রিয়ারই চেনা ছবি। পাতা ঝরে পড়া মানে গাছের কাছে ক্ষতি নয়, বরং শরীর থেকে জমে থাকা লবণের বোঝা নামিয়ে ফেলা। বেশির ভাগ ম্যানগ্রোভই এই তিন কৌশলের একটি নয়, বরং কমবেশি সবগুলোকেই কাজে লাগায়।

কাদার নিচে অক্সিজেন নেই, তাই শিকড় ওপরে ওঠে

লবণ তো একটা সমস্যা, দ্বিতীয় সমস্যাটি শ্বাস নেওয়ার। শিকড়েরও শ্বাস নিতে হয়, আর সেই অক্সিজেন সে নেয় মাটির কণার ফাঁকে জমে থাকা বাতাস থেকে। কিন্তু সুন্দরবনের মাটি হলো জোয়ারের পলি জমে তৈরি আঠালো কাদা, যা দিনে দুবার পানিতে ডুবে যায়। এমন কাদায় বাতাস ঢোকার ফাঁকই থাকে না।

সমাধান হিসেবে ম্যানগ্রোভ শিকড়ের একটি অংশ পাঠিয়ে দেয় ঠিক উল্টো দিকে—নিচের দিকে না গিয়ে মাটির ওপরে। এগুলোই শ্বাসমূল, স্থানীয়ভাবে অনেকে বলেন শ্বাসকন্দ। ভাটার সময় সুন্দরবনের কাদা জেগে উঠলে দেখা যায়, হাজার হাজার সরু খুঁটির মতো এই শিকড় মাটি ফুঁড়ে খাড়া হয়ে আছে। এদের গায়ে থাকে অসংখ্য ছোট ছিদ্র, যার ভেতর দিয়ে বাতাস ঢুকে নিচের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

সুন্দরী গাছের গোড়ার চারপাশেও এমন শ্বাসমূল দেখা যায়, আর কেওড়া গাছের শ্বাসমূল তো রীতিমতো ঘন বেড়ার মতো ছড়িয়ে থাকে। জোয়ারের সময় এগুলো ডুবে যায়, ভাটার সময় আবার জেগে ওঠে—এই ছন্দেই চলে গোটা বনের শ্বাস-প্রশ্বাস। শুধু তা-ই নয়, এই খুঁটির জঙ্গল পলি আটকে রেখে মাটিকে ধরে রাখে, নরম কাদায় গাছকে দাঁড়িয়ে থাকতেও সাহায্য করে।

মাটিতে নয়, গাছেই যেভাবে চারা তৈরি হয়

সব সমস্যার শেষ এখানেই নয়। ধরা যাক গাছটি বেঁচে থাকল, ফল ধরল, বীজও তৈরি হলো। কিন্তু সেই বীজ যদি কাদায় পড়ে, জোয়ারের পানি তাকে ভাসিয়ে দূরে নিয়ে যেতে পারে, লোনা পানিতে সে পচেও যেতে পারে। নরম কাদায় শিকড় বসানোর সময়টুকুও সে পায় না।

এই সমস্যার সমাধানে কিছু ম্যানগ্রোভ এক অদ্ভুত পথ নিয়েছে—বীজ মাটিতে পড়ার অপেক্ষা না করে গাছেই অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। উদ্ভিদবিজ্ঞানে এই কৌশলের নাম ভিভিপ্যারি। মা-গাছের গায়ে থাকতে থাকতেই বীজ থেকে লম্বা, পেনসিলের মতো একটি চারা বেরিয়ে আসে, আর মা-গাছ থেকেই সে খাবার ও পানি পেতে থাকে।

যথেষ্ট বড় হওয়ার পর সেই চারা গাছ থেকে খসে পড়ে। ভাগ্য ভালো হলে সে সোজা গিয়ে নরম কাদায় গেঁথে যায় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই শিকড় ছড়াতে শুরু করে। আবার পানিতে পড়লে সে ভাসতে ভাসতে দূরে চলে যায় এবং উপযুক্ত জায়গা পেলে সেখানে গিয়ে গেড়ে বসে। গরান জাতীয় গাছে এই কৌশল স্পষ্ট চোখে পড়ে। এভাবেই ম্যানগ্রোভ বন নিজে নিজেই নতুন চরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ঝড়ের সামনে ঢাল, অথচ নিজেই এখন চাপে

এই গোটা ব্যবস্থাটির সুফল কেবল গাছেরা পায় না, পায় উপকূলের মানুষও। বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় যখন স্থলভাগের দিকে আসে, সুন্দরবনের ঘন গাছপালা ও শ্বাসমূলের জাল প্রথম ধাক্কাটা নিজের গায়ে নেয়। বাতাসের গতি কমে, জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা কিছুটা কমে আসে, ভাঙন ধীর হয়। সিডর বা আইলার মতো বড় ঘূর্ণিঝড়ের পর বারবার এ কথাই উঠে এসেছে—সুন্দরবন সামনে না থাকলে ক্ষয়ক্ষতি আরও অনেক বেশি হতে পারত।

কিন্তু এই ঢালটিই এখন চাপে আছে। উজান থেকে আসা মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বনের ভেতরে লবণাক্ততা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সুন্দরী গাছ যেহেতু লবণ ঠেকিয়ে চলে, বাড়তি লবণ তার জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। বহু জায়গায় সুন্দরী গাছের মাথা থেকে শুকিয়ে আসার সমস্যা দেখা যাচ্ছে, যা এলাকায় আগামরা রোগ নামেই পরিচিত।

সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও চাপ—অপরিকল্পিত চিংড়ি ঘের, দূষণ, গাছ কাটা আর ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়। ম্যানগ্রোভের কৌশলগুলো লাখো বছরের বিবর্তনে তৈরি, কিন্তু সেগুলোর একটা সীমা আছে। লবণাক্ততা যদি সেই সীমা ছাড়িয়ে যায়, গাছের ছাঁকনি বা লবণগ্রন্থি কোনোটিই আর যথেষ্ট হবে না।

শেষ কথা

সুন্দরবনের গাছ লবণপানিতে বেঁচে থাকে কোনো জাদুতে নয়, বরং একগুচ্ছ নিখুঁত কৌশলে—শিকড়ে ছাঁকনি, পাতায় লবণ বের করার গ্রন্থি, পুরোনো পাতায় লবণ জমিয়ে তা ঝরিয়ে ফেলা, কাদার ওপর জেগে ওঠা শ্বাসমূল আর গাছেই তৈরি হয়ে যাওয়া চারা। এতগুলো সমাধান একসঙ্গে কাজ করে বলেই লবণ-কাদা-জোয়ারের এই কঠিন জায়গাটিতে এমন একটি বন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।

এই বন আমাদের গর্বের জায়গা, আবার দায়িত্বেরও। প্রকৃতি তার হাতে থাকা সব কৌশল দিয়ে সুন্দরবনকে টিকিয়ে রেখেছে; বাকি ঝুঁকিগুলো—লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটা—অনেকটাই মানুষের হাতে তৈরি। ফলে এই বনের ভবিষ্যৎও অনেকখানি আমাদের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

সুন্দরবন ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা আছে আপনার? কী দেখে সবচেয়ে অবাক হয়েছিলেন, কমেন্টে লিখুন।

সূত্র: বন ও পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন
জলবায়ু পরিবর্তন পরিবেশ প্রকৃতি বাংলাদেশ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন
জ
জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক

প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।

সম্পর্কিত লেখা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আসলে কীভাবে শেখে
বিজ্ঞান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আসলে কীভাবে শেখে

৩ মিনিট পড়া
আকাশ কেন নীল, আর সূর্যাস্ত কেন লাল
বিজ্ঞান

আকাশ কেন নীল, আর সূর্যাস্ত কেন লাল

৩ মিনিট পড়া
ব্ল্যাকহোল আসলে কী, এর ভেতরে কী ঘটে
বিজ্ঞান

ব্ল্যাকহোল আসলে কী, এর ভেতরে কী ঘটে

৩ মিনিট পড়া

প্রতিদিন নতুন কিছু জানুন

সপ্তাহে একবার, সেরা লেখাগুলো সরাসরি আপনার ইনবক্সে। স্প্যাম নেই।