ঘুমের সময় আমাদের শরীরে আসলে কী ঘটে
ঘুম মানে শুধু বিশ্রাম নয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক ও শরীরে চলে নিঃশব্দ এক মেরামতকর্ম। জেনে নিন ঘুমের সময় আমাদের ভেতরে আসলে কী ঘটে।
আমরা জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় ঘুমিয়ে কাটাই। অনেকেই ভাবেন, ঘুম মানে শরীর-মন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া, নিছক সময় নষ্ট। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ঠিক উল্টো কথা—ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীর আসলে ভীষণ ব্যস্ত থাকে, চলে নিঃশব্দ এক বিশাল মেরামত ও গোছানোর কাজ।
চলুন জেনে নিই, চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় আমাদের ভেতরে আসলে কী ঘটে।
ঘুম একটানা নয়, কয়েকটি ধাপে চলে
আমাদের ঘুম একরকম নয়; রাতভর তা কয়েকটি ধাপ বা চক্রের মধ্য দিয়ে চলে। প্রতিটি চক্র মোটামুটি দেড় ঘণ্টার মতো, আর রাতে এমন কয়েকটি চক্র সম্পন্ন হয়। এই চক্রগুলোকে মোটাদাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—গভীর ঘুমের ধাপ আর স্বপ্নের ধাপ।
শুরুতে আমরা হালকা ঘুমে তলিয়ে যাই, এরপর ধীরে ধীরে নামি গভীর ঘুমে। তারপর আসে স্বপ্নের ধাপ, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম। সারা রাত ধরে এই ধাপগুলো ঘুরেফিরে আসে।
গভীর ঘুমে শরীর নিজেকে সারায়
গভীর ঘুমের ধাপটি মূলত শরীরের মেরামতের সময়। এ সময় শরীর কোষের ক্ষয়পূরণ করে, পেশি গঠন করে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এই ধাপেই নিঃসৃত হয় বৃদ্ধির জন্য জরুরি হরমোন।
এ কারণেই অসুস্থ অবস্থায় শরীর বেশি ঘুম চায়—গভীর ঘুমই শরীরকে দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত গভীর ঘুম না হলে শরীর ক্লান্ত থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
স্বপ্নের ধাপে মস্তিষ্ক স্মৃতি গোছায়
আরইএম বা স্বপ্নের ধাপটি বিশেষভাবে মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মজার ব্যাপার হলো, এই সময় শরীরের পেশি প্রায় অসাড় থাকে, অথচ মস্তিষ্ক থাকে দিনের মতোই সক্রিয়। বেশিরভাগ স্পষ্ট স্বপ্ন আমরা এই ধাপেই দেখি।
বিজ্ঞানীদের মতে, এ সময় মস্তিষ্ক সারা দিনের শেখা তথ্য ও অভিজ্ঞতা গুছিয়ে নেয়, গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলোকে স্থায়ী করে আর অপ্রয়োজনীয় তথ্য বাদ দেয়। অনেকটা যেন দিনের সব ফাইল গুছিয়ে ঠিক জায়গায় রেখে দেওয়া। তাই ভালো ঘুম শেখা ও স্মৃতিশক্তির জন্যও জরুরি।
মস্তিষ্ক নিজেকে পরিষ্কার করে
ঘুমের সময় মস্তিষ্কে ঘটে আরেকটি চমৎকার প্রক্রিয়া। দিনভর কাজের ফলে মস্তিষ্কে নানা বর্জ্য পদার্থ জমা হয়। গবেষণা বলছে, ঘুমের সময় মস্তিষ্ক একধরনের পরিষ্কার-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই বর্জ্য সরিয়ে ফেলে।
এ যেন রাতের বেলা পুরো শহর পরিষ্কার করে পরদিনের জন্য প্রস্তুত করে রাখা। ঠিকমতো ঘুম না হলে এই পরিষ্কার-প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
কম ঘুমের মূল্য চোকাতে হয়
ঘুমের এই কাজগুলো বোঝার পর সহজেই অনুমান করা যায়, কম ঘুমালে কী হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে, মেজাজ খিটখিটে হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত রাতে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো আর শোয়ার ঘর শান্ত-অন্ধকার রাখা ভালো ঘুমে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
শেষ কথা
ঘুম মোটেও সময় নষ্ট নয়, বরং শরীর ও মনের জন্য অপরিহার্য এক নিঃশব্দ কর্মযজ্ঞ। গভীর ঘুমে শরীরের মেরামত, স্বপ্নের ধাপে স্মৃতির গোছানো আর মস্তিষ্কের নিজেকে পরিষ্কার করা—এসবই ঘটে আমাদের অজান্তে। তাই সুস্থ থাকতে চাইলে ভালো ঘুমকে অবহেলা না করে গুরুত্ব দিন; এটি আসলে প্রকৃতির দেওয়া সবচেয়ে সহজ ওষুধ।
আপনি কি প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম পান? আপনার ঘুমের রুটিন কেমন, কমেন্টে জানান।
সূত্র: বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও নিউরোসায়েন্স প্রতিবেদন
প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।



