১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • ঢাকা আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ নিউজলেটার
সাবস্ক্রাইব
হোম বিজ্ঞান
বিজ্ঞান

বৃষ্টির পর মাটির সোঁদা গন্ধ আসে কেন? পেছনের বিজ্ঞান

বৃষ্টি নামলেই মাটি থেকে যে সোঁদা গন্ধ ভেসে আসে, তার নাম পেট্রিকর। এর পেছনে আছে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া আর রসায়নের মজার গল্প। জেনে নিন আসল কারণ।

জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • ৩ মিনিট পড়া
বৃষ্টির পর মাটির সোঁদা গন্ধের বিজ্ঞান

গরমে শুকিয়ে থাকা মাটিতে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক চেনা, মন ভালো করা সোঁদা গন্ধ। গ্রামের উঠান থেকে শহরের ছাদ—এই গন্ধ আমাদের সবার পরিচিত। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, মাটি থেকে ঠিক কী কারণে এই গন্ধটা আসে? এর পেছনে লুকিয়ে আছে ব্যাকটেরিয়া আর রসায়নের চমৎকার এক খেলা।

গন্ধটার একটা নামও আছে — পেট্রিকর

বৃষ্টির পর মাটির এই বিশেষ গন্ধের একটি বৈজ্ঞানিক নাম আছে—পেট্রিকর (Petrichor)। গ্রিক শব্দ *পেট্রা* (পাথর) আর *আইকর* (দেবতাদের শিরায় বয়ে চলা তরল) মিলে এই নাম। ১৯৬০-এর দশকে দুই অস্ট্রেলীয় গবেষক প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন, যখন তাঁরা খুঁজে বের করেন শুকনো মাটিতে বৃষ্টি পড়লে ঠিক কী ঘটে।

আসল নায়ক: জিওসমিন নামের এক যৌগ

এই গন্ধের মূল উৎস জিওসমিন (Geosmin) নামের একটি জৈব যৌগ। এটি তৈরি করে মাটিতে বাস করা অ্যাক্টিনোব্যাকটেরিয়া, বিশেষ করে *স্ট্রেপ্টোমাইসিস* নামের একদল ব্যাকটেরিয়া। শুকনো মৌসুমে এই ব্যাকটেরিয়া স্পোর তৈরি করে আর মাটিতে জিওসমিন জমতে থাকে।

মজার ব্যাপার হলো, মানুষের নাক জিওসমিনের প্রতি অবিশ্বাস্য রকম সংবেদনশীল। বাতাসে প্রতি ট্রিলিয়ন ভাগে মাত্র কয়েক ভাগ জিওসমিন থাকলেও আমরা তা টের পেয়ে যাই—হাঙর যেমন রক্তের গন্ধ পায়, অনেকটা সেরকম।

বৃষ্টির ফোঁটা কীভাবে গন্ধ ছড়ায়

শুধু জিওসমিন থাকলেই তো হবে না, সেটা আমাদের নাক পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। এখানেই বৃষ্টির ফোঁটার জাদু। উচ্চগতির ক্যামেরায় গবেষকরা দেখেছেন—

শুকনো মাটিতে একটি বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির ক্ষুদ্র ছিদ্রে আটকে থাকা বাতাস ছোট ছোট বুদবুদ হয়ে ওপরে উঠে আসে। ফোঁটার আঘাতে এই বুদবুদ ফেটে গিয়ে অসংখ্য সূক্ষ্ম জলকণা বা অ্যারোসল বাতাসে ছিটকে দেয়। এই অ্যারোসলের সঙ্গেই মিশে থাকে জিওসমিন আর মাটির অন্যান্য সুগন্ধি যৌগ। বাতাস সেগুলো ছড়িয়ে দেয় চারদিকে, আর আমরা পাই সেই চেনা সোঁদা গন্ধ।

বৃষ্টির আগে অন্য একটা গন্ধ — সেটা কী

অনেক সময় বৃষ্টি নামার ঠিক আগে একটা তীক্ষ্ণ, খানিকটা ধাতব গন্ধ পাওয়া যায়। সেটি কিন্তু পেট্রিকর নয়—সেটি ওজোন। বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ বাতাসের অক্সিজেন অণু ভেঙে ওজোন তৈরি করে, আর ঝড়ো বাতাস সেই গন্ধ আগেভাগে আমাদের কাছে নিয়ে আসে। অর্থাৎ ঝড়ের আগের গন্ধ আর বৃষ্টির পরের গন্ধ—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনা।

আমরা কেন এই গন্ধ এত পছন্দ করি

কেউ কেউ মনে করেন, এর পেছনে আছে বিবর্তনের ছাপ। যেসব পূর্বপুরুষ পানির উৎস বা বৃষ্টির ইঙ্গিত দ্রুত চিনতে পারতেন, খরাপ্রবণ পরিবেশে তাঁদের টিকে থাকার সম্ভাবনা ছিল বেশি। তাই মাটির এই গন্ধের প্রতি আমাদের টান হয়তো হাজার হাজার বছরের অভ্যাসের ফল। প্রমাণিত না হলেও, ব্যাখ্যাটি বেশ যুক্তিসংগত।

শেষ কথা

পরের বার বৃষ্টিতে মাটির সোঁদা গন্ধ পেলে মনে রাখবেন—এটি নিছক “মাটির গন্ধ” নয়, বরং মাটির অণুজীব, একটি বিশেষ রাসায়নিক যৌগ আর বৃষ্টির ফোঁটার পদার্থবিদ্যা মিলে তৈরি হওয়া এক নিখুঁত প্রাকৃতিক আয়োজন। প্রকৃতির সবচেয়ে সাধারণ অভিজ্ঞতাগুলোর পেছনেও যে কত বিস্ময় লুকিয়ে থাকে, পেট্রিকর তার একটি সুন্দর উদাহরণ।

প্রকৃতির আর কোন ব্যাপারটি নিয়ে আপনার কৌতূহল জাগে? কমেন্টে লিখে জানান—পরের লেখায় উত্তর খুঁজব।

জানা-অজানা পেট্রিকর প্রকৃতি বিজ্ঞান বৃষ্টি মাটির গন্ধ
জানাশোনা বিজ্ঞান ডেস্ক

প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।

সম্পর্কিত লেখা

জমি ছাড়াই দালানের ভেতরে ফসল, শহরের বুকেই কি হবে কৃষি বিপ্লব
বিজ্ঞান

জমি ছাড়াই দালানের ভেতরে ফসল, শহরের বুকেই কি হবে কৃষি বিপ্লব

৪ মিনিট পড়া
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আসলে কীভাবে শেখে
বিজ্ঞান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আসলে কীভাবে শেখে

৩ মিনিট পড়া
ব্ল্যাকহোল আসলে কী, এর ভেতরে কী ঘটে
বিজ্ঞান

ব্ল্যাকহোল আসলে কী, এর ভেতরে কী ঘটে

৩ মিনিট পড়া

প্রতিদিন নতুন কিছু জানুন

সপ্তাহে একবার, সেরা লেখাগুলো সরাসরি আপনার ইনবক্সে। স্প্যাম নেই।