১৬ অক্টোবর ২০২৬ • ঢাকা আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ নিউজলেটার
সাবস্ক্রাইব
হোম ›সম্পর্ক ও পরিবার
সম্পর্ক ও পরিবার

শিশু কথা বলতে দেরি করছে—কখন স্বাভাবিক, কখন নয়

শিশুর কথা বলতে দেরি হচ্ছে? ভাষা বিকাশের স্বাভাবিক ধারা, দুই ভাষার প্রভাব, বাড়িতে সাহায্য করার উপায় আর কোন লক্ষণে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি—জেনে নিন।

জ
জানাশোনা ডেস্ক
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • ৭ মিনিট পড়া
মায়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছে ছোট্ট শিশু

পাশের বাসার সমবয়সী শিশুটি গড়গড় করে কথা বলছে, অথচ আপনার সন্তান এখনো হাতে ইশারা করে, দু-একটা আধো শব্দ বলে থেমে যায়। আত্মীয়স্বজন এসে মন্তব্য করছেন, কেউ ভরসা দিচ্ছেন “সময় হলেই বলবে”, কেউ আবার চিন্তা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। বাবা-মায়ের মনের ভেতর তখন একটাই প্রশ্ন ঘোরে—এটা কি স্বাভাবিক দেরি, নাকি কিছু একটা ঠিক নেই?

প্রথমেই একটা কথা মনে রাখা দরকার—কথা বলার ব্যাপারে শিশুদের মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশি, এবং তা স্বাভাবিক। কোনো শিশু তাড়াতাড়ি শব্দ জোড়া লাগানো শিখে যায়, কোনো শিশু অনেক দিন চুপচাপ শুনে যায়, তারপর হঠাৎ যেন বাঁধ ভেঙে কথা শুরু করে। কিন্তু “সব শিশু আলাদা” বলে সব উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়—কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ আছে, যেগুলো দেখলে অপেক্ষা না করে বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত। এই লেখায় দুটো দিকই সৎভাবে বলার চেষ্টা করা হলো।

ভাষা যেভাবে ধীরে ধীরে জন্ম নেয়

শিশুর ভাষা শেখা শুরু হয় প্রথম শব্দ বলারও অনেক আগে। জন্মের পরের মাসগুলোতে শিশু নানা রকম আওয়াজ করে—গলার ভেতর থেকে “আ-উ” ধরনের সুর তোলে, মায়ের গলার স্বর শুনে সাড়া দেয়। এরপর আসে আধো-বুলির পর্ব, যখন শিশু “বা-বা-বা”, “দা-দা-দা” ধরনের একই শব্দাংশ বারবার বলতে থাকে। এই পর্বটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই শিশু মুখ, জিভ আর শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ অনুশীলন করে।

তারপর ধীরে ধীরে অর্থসহ এক-একটি শব্দ আসে—”মা”, “পানি”, “না”। শব্দভান্ডার কিছুটা বাড়ার পর শিশু দুটি শব্দ জোড়া লাগাতে শেখে—”মা আসো”, “পানি দাও”। এই জোড়া লাগানোর ক্ষমতাটিই আসলে ভাষার বড় লাফ, কারণ এখানেই শিশু বুঝিয়ে দেয় যে সে শব্দগুলো মুখস্থ বলছে না, নিজের মতো করে সাজাচ্ছে।

তবে এই ধাপগুলো ঘড়ি ধরে আসে না। কোনো শিশু এক ধাপে অনেক দিন থেমে থাকে, আবার হঠাৎ দ্রুত এগোয়। শব্দ বলার আগে সে কী বোঝে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ—আপনি “জুতা নিয়ে এসো” বললে যদি শিশু জুতা এনে দেয়, তার মানে ভাষা তার ভেতরে তৈরি হচ্ছে, শুধু মুখ দিয়ে বেরোতে সময় নিচ্ছে।

প্রতিটি শিশুর ঘড়ি কেন আলাদা

শিশুরা একই সঙ্গে অনেক কিছু শেখে—হাঁটা, দৌড়ানো, হাতের কাজ, ভাষা। অনেক সময় দেখা যায়, যে শিশুটি তাড়াতাড়ি হাঁটতে শিখেছে, সে কথা শুরু করেছে একটু দেরিতে; আবার উল্টোটাও হয়। মস্তিষ্ক যখন একটি দক্ষতায় বেশি মনোযোগ দেয়, অন্যটি কিছুদিন অপেক্ষা করে।

পারিপার্শ্বিকতারও ভূমিকা আছে। যে শিশুকে ঘিরে সারাদিন কথাবার্তা চলে, গল্প হয়, প্রশ্ন করা হয়—তার শব্দভান্ডার সাধারণত দ্রুত বাড়ে। আবার পরিবারে যদি শিশুর প্রয়োজন সে মুখ খোলার আগেই সবাই বুঝে ফেলে এবং মিটিয়ে দেয়, তাহলে কথা বলার তাগিদটাই কমে যায়। বড় ভাইবোন সব সময় হয়ে কথা বলে দিলেও ছোটজনের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে।

শিশুর স্বভাবও একটা কারণ। কিছু শিশু স্বভাবতই পর্যবেক্ষক—তারা আগে দেখে, বোঝে, নিশ্চিত হয়, তারপর মুখ খোলে। এমন শিশুর ক্ষেত্রে শুরুটা দেরিতে হলেও শুরু হওয়ার পর অগ্রগতি বেশ দ্রুত হয়।

দুই ভাষার পরিবারে বড় হলে কি শিশু পিছিয়ে পড়ে

এটি সম্ভবত সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা। অনেক পরিবারে বাসায় বাংলা, স্কুলে বা টিভিতে ইংরেজি, আবার দাদা-দাদির সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষা—এই মিশেল নিয়ে বাবা-মা দুশ্চিন্তায় পড়েন। কেউ কেউ পরামর্শ দেন, শিশুর সামনে এক ভাষা ছাড়া আর কিছু বলবেন না।

বাস্তবে একাধিক ভাষার সংস্পর্শ শিশুর ভাষা বিকাশে সমস্যা তৈরি করে না। শিশুর মস্তিষ্ক একসঙ্গে একাধিক ভাষা আলাদা করে নিতে পারে। দুই ভাষার শিশু হয়তো এক-একটি ভাষায় শব্দ কিছু কম জানে, কিন্তু দুই ভাষা মিলিয়ে তার মোট শব্দভান্ডার একই বয়সের অন্য শিশুদের সঙ্গে তুলনীয়ই থাকে। শুরুতে দুই ভাষার শব্দ মিশিয়ে বলাও অস্বাভাবিক নয়—এটি বিভ্রান্তির লক্ষণ নয়, বরং সে যা যা জানে তা কাজে লাগানোর চেষ্টা।

তাই ভাষা কমিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। বরং যিনি যে ভাষায় স্বচ্ছন্দ, তিনি সেই ভাষাতেই শিশুর সঙ্গে কথা বলুন—আধা-জানা ভাষায় কম কথা বলার চেয়ে ভালো জানা ভাষায় প্রাণবন্ত অনেক কথা বলা শিশুর জন্য অনেক বেশি উপকারী।

বাড়িতে যেভাবে ভাষার জায়গা তৈরি করবেন

সবচেয়ে কার্যকর উপায়টি সহজ—শিশুর সঙ্গে বেশি কথা বলুন। রান্না করতে করতে বলুন কী করছেন, গোসল করানোর সময় শরীরের অঙ্গের নাম বলুন, বাজারে গেলে জিনিসের নাম বলুন। শিশু উত্তর দিতে না পারলেও শুনছে, আর শোনাটাই ভাষার ভিত।

শিশু যখন কিছু বলার চেষ্টা করে—হোক তা অস্পষ্ট আওয়াজ বা আঙুলের ইশারা—সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিন। সে “পা” বললে আপনি বলুন, “হ্যাঁ, পানি খাবে? এই নাও পানি।” শুধরে না দিয়ে বরং পূর্ণ বাক্যে ফিরিয়ে বলাটা সবচেয়ে ভালো কাজ করে। এতে শিশু বোঝে, তার চেষ্টার একটা ফল আছে—আর এই বোঝাটাই তাকে বারবার চেষ্টা করতে উৎসাহ দেয়।

ছবিওয়ালা বই নিয়ে পাশে বসুন, প্রতিদিন অল্প সময়ের জন্য হলেও। পুরো গল্প পড়তে না পারলেও ছবি দেখিয়ে নাম বলা, “এটা কী?” জিজ্ঞেস করা—এসবই কাজে দেয়। ছড়া আর গান শিশুর ভাষার জন্য দারুণ, কারণ সুর আর পুনরাবৃত্তি শব্দ মনে রাখা সহজ করে দেয়।

আর একটি জিনিসে লাগাম টানুন—স্ক্রিন। মোবাইল বা টিভির সামনে বসিয়ে খাওয়ানোর অভ্যাসটি খুব সাধারণ, কিন্তু স্ক্রিন থেকে আসা কথা একমুখী; শিশু সাড়া দিলে ওপাশ থেকে কিছু ফিরে আসে না। ভাষা শেখার জন্য দরকার জীবন্ত মানুষের সঙ্গে দেওয়া-নেওয়া। স্ক্রিনের সময় কমিয়ে সেটুকু সময় কথা বলা, খেলা আর গল্পে দিলে পার্থক্য অনেক সময় চোখে পড়ার মতো হয়।

যেসব লক্ষণে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন

এতক্ষণ যা বলা হলো তা সাধারণ ধারণা—কিন্তু কিছু লক্ষণ আছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে “আরেকটু দেখি” বলে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। নাম ধরে ডাকলে শিশু যদি বারবার সাড়া না দেয়, পেছনে জোরে শব্দ হলেও যদি চমকে না ওঠে, তাহলে শোনায় সমস্যা আছে কি না তা পরীক্ষা করানো জরুরি। শোনার সমস্যা প্রায়ই আড়ালে থাকে, অথচ কথা না বলার এটি একটি সাধারণ কারণ—আর সময়মতো ধরা পড়লে অনেক কিছু করার থাকে।

চোখে চোখ না রাখা, ডাকলে মুখ না ফেরানো, হাসি বা ইশারার বিনিময়ে আগ্রহ না দেখানো—এগুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখার মতো। ভাষা কেবল শব্দ নয়, যোগাযোগের ইচ্ছাও; শিশু যদি হাত নেড়ে, আঙুল দেখিয়ে বা টেনে নিয়ে গিয়েও কিছু বোঝানোর চেষ্টা না করে, তাহলে বিষয়টি আলোচনা করা দরকার।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন একটি বিষয়ে—শিশু যদি আগে শেখা শব্দ বা দক্ষতা হারিয়ে ফেলে। আগে “মা” বলত, এখন আর বলে না; আগে ইশারা করত, এখন করে না—এই ধরনের পিছিয়ে যাওয়া কখনোই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া উচিত নয়, দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

এ ছাড়া যদি মনে হয় শিশু কথা বুঝতেই পারছে না, সহজ নির্দেশ পালন করতে পারছে না, কিংবা আপনার নিজের ভেতরেই একটা খচখচানি থেকে যাচ্ছে—তাহলে সেটিকেও যথেষ্ট কারণ ধরুন। শিশু-বিশেষজ্ঞ, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট বা শিশুর বিকাশ নিয়ে কাজ করেন এমন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। মনে রাখবেন, এই লেখা কেবল সাধারণ তথ্য—আপনার সন্তানের অবস্থা কেমন, তা কেবল একজন চিকিৎসকই সরাসরি দেখে বলতে পারবেন।

শেষ কথা

শিশুর কথা বলতে দেরি হলে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক, আর সেই দুশ্চিন্তার জন্য লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিশুটি নিজের গতিতেই এগোচ্ছিল—শুধু আশপাশের তুলনাটা অস্থির করে তুলেছিল। বাড়িতে বেশি কথা, বেশি গল্প আর কম স্ক্রিন—এইটুকু বদলই অনেক সময় বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।

আবার পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্তটাও কখনো ভুল হয় না। কিছু না পাওয়া গেলে আপনি নিশ্চিন্ত হবেন, আর কিছু পাওয়া গেলে তাড়াতাড়ি শুরু করা যাবে—দুই দিক থেকেই লাভ। অপেক্ষা করার চেয়ে জেনে নেওয়া সব সময় ভালো।

আপনার শিশুর প্রথম শব্দটি কী ছিল, আর কখন বলেছিল? কমেন্টে জানান।

সূত্র: বিভিন্ন শিশুস্বাস্থ্য ও শিশুবিকাশ বিষয়ক নির্দেশিকা ও প্রতিবেদন
প্যারেন্টিং ভাষা শিক্ষা মা ও শিশু শিশুর বিকাশ শিশুর যত্ন
জ
জানাশোনা ডেস্ক

প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।

সম্পর্কিত লেখা

যৌথ পরিবারে মানিয়ে চলার বাস্তব কৌশল
সম্পর্ক ও পরিবার

যৌথ পরিবারে মানিয়ে চলার বাস্তব কৌশল

৩ মিনিট পড়া
সন্তানকে মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখবেন যেভাবে
সম্পর্ক ও পরিবার

সন্তানকে মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখবেন যেভাবে

৩ মিনিট পড়া
বিয়ের আগে যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা জরুরি
সম্পর্ক ও পরিবার

বিয়ের আগে যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা জরুরি

৩ মিনিট পড়া

প্রতিদিন নতুন কিছু জানুন

সপ্তাহে একবার, সেরা লেখাগুলো সরাসরি আপনার ইনবক্সে। স্প্যাম নেই।