১৬ অক্টোবর ২০২৬ • ঢাকা আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ নিউজলেটার
সাবস্ক্রাইব
হোম ›স্বাস্থ্য
স্বাস্থ্য

রাতে বিছানায় গেলেই দুশ্চিন্তা বাড়ে কেন, থামাবেন যেভাবে

রাতে দুশ্চিন্তা বাড়ে কেন, আর ঘুমের আগে মনটাকে শান্ত করার বাস্তব উপায় কী কী—জেনে নিন সহজ বাংলায়, সঙ্গে কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন।

জ
জানাশোনা স্বাস্থ্য ডেস্ক
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • ৭ মিনিট পড়া
রাতে বিছানায় জেগে থাকা একজন মানুষ

সারাটা দিন দিব্যি কেটে গেল। অফিস, রান্না, বাজার, বাচ্চার পড়া—একের পর এক কাজ, নিঃশ্বাস ফেলার সময়ও নেই। তারপর রাত এল, বাতি নিভল, আর বালিশে মাথা রাখার ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে মাথার ভেতর যেন একটা সভা বসে গেল। আজকের ওই কথাটা কি ভুল বলে ফেলেছিলাম? মাস শেষে টাকাটা কুলাবে তো? বাবার শরীরটা যে খারাপ যাচ্ছে, ডাক্তার দেখানো হলো না কেন?

অনেকেরই এই অভিজ্ঞতা আছে—দিনের বেলায় যে চিন্তাগুলো ধারেকাছেও আসে না, রাতে বিছানায় শুতেই সেগুলো ভিড় করে দাঁড়ায়। ব্যাপারটা এলোমেলো কিছু নয়; এর পেছনে বেশ বোধগম্য কিছু কারণ আছে। কারণগুলো বুঝলে সামলানোর পথটাও অনেক সহজ হয়ে যায়।

দিনের কোলাহল থেমে গেলে মনের ভেতর যা ঘটে

সারাদিন আমাদের মনোযোগ বাইরের দিকে টানা থাকে। ফোন বাজছে, কেউ ডাকছে, রাস্তার হর্ন, রান্নার তাড়া, ইনবক্সে জমা মেসেজ—এসব আমাদের মনোযোগ দখল করে রাখে। ভেতরে জমতে থাকা অমীমাংসিত চিন্তাগুলো তখন সামনে আসার জায়গা পায় না, কিন্তু মুছেও যায় না। তারা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে।

রাতে যখন বাইরের সব উদ্দীপনা সরে যায়, ঘর অন্ধকার আর নিস্তব্ধ হয়, তখন মন হঠাৎ খালি একটা মঞ্চ পেয়ে যায়। দিনভর লাইনে দাঁড়ানো চিন্তাগুলো একসঙ্গে মঞ্চে উঠে পড়ে। তাই মনে হয়, রাত এলেই দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়—আসলে চিন্তাগুলো নতুন করে তৈরি হয়নি, শুধু এতক্ষণে শোনা যাচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি ব্যাপার—রাতে করার মতো কিছু নেই। দিনের বেলা দুশ্চিন্তা এলে আপনি একটা ফোন করতে পারেন, কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, কাজটা সেরে ফেলতে পারেন। রাত দুইটায় সেসবের কোনো সুযোগ নেই। ফলে চিন্তাটা কোথাও গিয়ে শেষ হয় না, শুধু ঘুরপাক খেতে থাকে।

ক্লান্ত মস্তিষ্ক রাতে সমাধান খুঁজে পায় না কেন

দিনশেষে মস্তিষ্কও ক্লান্ত। সারাদিন ছোট-বড় অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে নিতে ভাবনার শক্তি কমে আসে। ক্লান্ত অবস্থায় আমরা জটিল সমস্যাকে গুছিয়ে ভাবতে পারি না, বিকল্প খুঁজে বের করতে পারি না, আর সম্ভাব্য খারাপ পরিণতিগুলোকে বাস্তবের চেয়ে বড় করে দেখি।

ফলে রাতের ভাবনা প্রায়ই এক জায়গায় ঘুরতে থাকে। একই দুশ্চিন্তা বারবার ফিরে আসে, কিন্তু এক ইঞ্চিও এগোয় না। সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই একই সমস্যাকে অনেক সময় অনেক ছোট আর সামলানোর মতো মনে হয়—সমস্যাটা বদলায়নি, বদলেছে আপনার মস্তিষ্কের অবস্থা।

এই একটি উপলব্ধিই অনেকের কাজে লাগে। রাত দুইটায় জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নয়। নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে—”এটা ভাবার মতো ভালো সময় এখন নয়, কাল সকালে দেখব।”

ফোনের স্ক্রিন রাতের দুশ্চিন্তাকে যেভাবে উসকে দেয়

ঘুম আসছে না দেখে ফোনটা হাতে তুলে নেওয়া—এই অভ্যাস এখন প্রায় সর্বজনীন। কিন্তু এতে সমস্যা কমার বদলে বাড়ে। স্ক্রিনের আলো মস্তিষ্ককে জাগিয়ে রাখে, আর স্ক্রল করতে করতে সময় কোথা দিয়ে চলে যায় বোঝাও যায় না।

সমস্যা শুধু আলোর নয়, বিষয়বস্তুরও। রাতে ফিডে ভেসে আসা দুঃসংবাদ, অন্যের সাজানো-গোছানো জীবনের ছবি, কিংবা কাজের গ্রুপে হুট করে আসা একটা মেসেজ—সবই মনকে আরও অস্থির করে তোলে। তারপর ফোন রেখে চোখ বন্ধ করলে সেই উত্তেজনা নিয়েই আপনি চিন্তার ঘূর্ণিতে ঢুকে পড়েন।

খুব কড়া নিয়ম না করেও একটা সহজ শুরু করা যায়—ঘুমানোর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে ফোনটা হাতের নাগালের বাইরে রেখে দেওয়া। চার্জারটা বিছানা থেকে দূরে সরিয়ে রাখলে কাজটা সহজ হয়। অ্যালার্মের জন্য ফোন লাগলে সেটি ঘরের অন্য প্রান্তে রাখুন।

চিন্তা থামাতে যে অভ্যাসগুলো সত্যিই কাজে লাগে

প্রথম কৌশলটি খুব সাধারণ, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে কার্যকর—ঘুমানোর আগে চিন্তাগুলো কাগজে লিখে ফেলা। একটা খাতা আর কলম বিছানার পাশে রাখুন। মাথায় যা যা ঘুরছে, গুছিয়ে না লিখে যেমন আসে তেমনই লিখে ফেলুন। কাল কী কী করতে হবে, তার একটা ছোট তালিকাও করে নিতে পারেন। মন যখন বুঝতে পারে চিন্তাটা কোথাও লেখা হয়ে গেছে, তখন সেটিকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার তাগিদ কমে যায়।

দ্বিতীয় কৌশলটি হলো দিনের বেলা নির্দিষ্ট একটা “দুশ্চিন্তার সময়” রাখা। বিকেলের দিকে পনেরো-বিশ মিনিট আলাদা করে নিন, বসে ভাবুন কোন বিষয়গুলো নিয়ে আপনি চিন্তিত, কোনটার সমাধান আপনার হাতে আছে আর কোনটার নেই। রাতে সেই চিন্তা ফিরে এলে নিজেকে বলুন—এটা তো আজ বিকেলেই ভেবেছি। শুনতে কৃত্রিম লাগলেও অনুশীলনে অনেকের ক্ষেত্রে এটি ভালো কাজ করে।

তৃতীয়টি শরীর দিয়ে মনকে শান্ত করার উপায়—ধীর শ্বাসের ব্যায়াম। আরাম করে শুয়ে নাক দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস নিন, একটু ধরে রাখুন, তারপর তার চেয়ে ধীরে মুখ দিয়ে ছাড়ুন। শ্বাস ছাড়াটা যেন নেওয়ার চেয়ে লম্বা হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। মনোযোগ শ্বাসের ওপর রাখলে চিন্তার স্রোত ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে আসে। কয়েক মিনিট করলেই অনেকে পার্থক্য টের পান।

বিছানাকে আবার ঘুমের জায়গা বানাবেন যেভাবে

আমাদের মন জায়গার সঙ্গে অভ্যাস জুড়ে নিতে ওস্তাদ। বিছানায় বসে যদি নিয়মিত অফিসের কাজ করেন, ফোন ঘাঁটেন, খান আর দুশ্চিন্তা করেন, তাহলে মন শিখে যায়—বিছানা মানে জেগে থাকার জায়গা। তাই যতটা সম্ভব বিছানাকে শুধু ঘুমের জন্য রাখার চেষ্টা করুন।

দ্বিতীয় নিয়মটি অদ্ভুত শোনালেও কাজের—বিছানায় গিয়ে মোটামুটি বিশ মিনিটেও ঘুম না এলে উঠে পড়ুন। ঘড়ি দেখার দরকার নেই, আন্দাজেই চলবে। ঘরের অন্য কোথাও গিয়ে অল্প আলোয় হালকা কিছু পড়ুন বা চুপচাপ বসে থাকুন, ফোন নয়। ঘুম-ঘুম ভাব এলে আবার বিছানায় ফিরুন। শুয়ে শুয়ে ছটফট করলে বিছানার সঙ্গে দুশ্চিন্তার সম্পর্কটাই বরং শক্ত হয়।

সবশেষে ঘুমের সময়সূচি। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া আর ওঠা—ছুটির দিনেও—শরীরের ভেতরের ঘড়িকে গুছিয়ে রাখে। এর সঙ্গে রাতের ঘরটা যতটা সম্ভব অন্ধকার ও ঠান্ডা রাখা, সন্ধ্যার পর চা-কফি এড়িয়ে চলা আর দিনের বেলা কিছুটা হাঁটাহাঁটি—এই ছোট অভ্যাসগুলো একসঙ্গে বেশ বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

কখন বুঝবেন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া দরকার

এই লেখার পরামর্শগুলো সাধারণ, দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা সামলানোর জন্য। কিন্তু সব দুশ্চিন্তা এক রকম নয়। যদি দুশ্চিন্তা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, প্রায় প্রতি রাতে ঘুম নষ্ট করে, কাজ-পড়াশোনা বা সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, কিংবা এর সঙ্গে বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট, ক্রমাগত মন খারাপ বা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা যুক্ত হয়—তখন নিজে নিজে সামলানোর চেষ্টায় আটকে না থেকে পেশাদার সাহায্য নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলা মানে “পাগল হয়ে যাওয়া” নয়—ঠিক যেমন জ্বর হলে ডাক্তার দেখানো মানে দুর্বলতা নয়। আমাদের সমাজে এই বিষয়ে যে সংকোচটা আছে, সেটিই বহু মানুষকে বছরের পর বছর কষ্ট পেতে বাধ্য করে। সাহায্য চাওয়া আসলে নিজের যত্ন নেওয়ারই একটা ধরন। আর মনে রাখবেন, কী ধরনের সহায়তা আপনার জন্য উপযুক্ত সেটি একজন প্রশিক্ষিত পেশাদারই বলতে পারবেন—নিজে থেকে কোনো ওষুধ শুরু করা বা কারও ওষুধ দেখে অনুসরণ করা কখনোই নিরাপদ নয়।

শেষ কথা

রাতে দুশ্চিন্তা বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, আর এটি আপনার দুর্বলতাও নয়। দিনের কোলাহল থেমে গেলে জমে থাকা ভাবনাগুলো সামনে আসে, আর ক্লান্ত মস্তিষ্ক সেগুলোর সমাধান খুঁজে পায় না—ব্যাপারটা মোটামুটি এটুকুই।

সব কৌশল একদিনে চেষ্টা করার দরকার নেই। আজ রাতে শুধু একটা কাজ করে দেখুন—ফোনটা দূরে রেখে চিন্তাগুলো কাগজে লিখে ফেলুন। কয়েক দিনের চেষ্টায় ছোট ছোট বদল জমতে থাকে, আর রাতগুলো ধীরে ধীরে একটু শান্ত হয়ে আসে। যদি না আসে, সাহায্য চাওয়ার দরজাটা সব সময়ই খোলা আছে।

ঘুমের আগে মন শান্ত করতে আপনার কোন উপায়টি কাজে লাগে? কমেন্টে লিখুন।

সূত্র: বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুমবিষয়ক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন
অভ্যাস উদ্বেগ ঘুম মানসিক স্বাস্থ্য রাতে দুশ্চিন্তা স্ট্রেস
জ
জানাশোনা স্বাস্থ্য ডেস্ক

প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।

সম্পর্কিত লেখা

ঘরে বসে ফিটনেসের সম্পূর্ণ গাইড: শুরু থেকে রুটিন, ব্যায়াম ও খাবার
স্বাস্থ্য

ঘরে বসে ফিটনেসের সম্পূর্ণ গাইড: শুরু থেকে রুটিন, ব্যায়াম ও খাবার

৫ মিনিট পড়া
নবজাতকের যত্নে নতুন বাবা-মায়ের জানা জরুরি বিষয়গুলো
স্বাস্থ্য

নবজাতকের যত্নে নতুন বাবা-মায়ের জানা জরুরি বিষয়গুলো

৩ মিনিট পড়া
ভাত খেলে মোটা হয়—কথাটা আসলে কতটা সত্যি
স্বাস্থ্য

ভাত খেলে মোটা হয়—কথাটা আসলে কতটা সত্যি

৬ মিনিট পড়া

প্রতিদিন নতুন কিছু জানুন

সপ্তাহে একবার, সেরা লেখাগুলো সরাসরি আপনার ইনবক্সে। স্প্যাম নেই।