মহাকাশে গেলে মানুষ লম্বা হয়ে যায়, ফিরলে আবার আগের মতো—কেন
মহাকাশে মানুষ লম্বা হয়ে যায়, পৃথিবীতে ফিরলে আবার আগের মাপে ফিরে আসে। মেরুদণ্ডে ঠিক কী ঘটে, আর শরীরের আর কী কী বদলায়—জেনে নিন।
মহাকাশ স্টেশনে কয়েক মাস কাটিয়ে আসা নভোচারীদের নিয়ে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়—তাঁরা রওনা দেওয়ার সময় যত লম্বা ছিলেন, ওপরে গিয়ে তার চেয়ে খানিকটা লম্বা হয়ে যান। শুনতে গল্পের মতো লাগে, কিন্তু কথাটা সত্যি। আর মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে ফিরে আসার কিছুদিনের মধ্যেই সেই বাড়তি উচ্চতা আবার হারিয়ে যায়, তাঁরা ফিরে যান আগের মাপে।
এখানে হাড় নতুন করে বাড়ে না, শরীরও নতুন কিছু তৈরি করে না। পুরো ঘটনাটা ঘটে মেরুদণ্ডের ভেতরে, আর তার পেছনে কাজ করে একটিমাত্র জিনিস—মাধ্যাকর্ষণ। আরও কৌতূহলের কথা, ছোট আকারে হলেও ঠিক এই একই ঘটনা আপনার-আমার শরীরেও ঘটছে, প্রতিদিন।
উচ্চতা বাড়ার আসল রহস্য যেখানে লুকানো
আমাদের মেরুদণ্ড একটানা একটা হাড় নয়। ছোট ছোট অনেকগুলো হাড় বা কশেরুকা একটির ওপর আরেকটি বসে মেরুদণ্ড তৈরি করে, আর প্রতি দুটি কশেরুকার মাঝখানে থাকে নরম, স্পঞ্জের মতো এক-একটি ডিস্ক। এই ডিস্কগুলোর ভেতরটা জেলির মতো, অনেকটা পানি দিয়ে ভরা। এগুলোর কাজ হলো ধাক্কা সামলানো—হাঁটা, দৌড়ানো বা লাফানোর সময় হাড়ে হাড়ে ঘষা লাগতে না দেওয়া।
পৃথিবীতে আমরা যতক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকি, ততক্ষণ মাধ্যাকর্ষণ শরীরের ওজনকে নিচের দিকে টানে, আর সেই চাপ পড়ে এই ডিস্কগুলোর ওপর। চাপে পড়ে ডিস্কগুলো একটু চ্যাপ্টা হয়ে থাকে, ভেতরের কিছু তরল বেরিয়ে যায়। মেরুদণ্ড তাই তার সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্যে কখনোই থাকে না।
মহাকাশে গিয়ে সেই টানটা কার্যত উধাও হয়ে যায়। ওজনের চাপ না থাকায় চ্যাপ্টা হয়ে থাকা ডিস্কগুলো ধীরে ধীরে ফুলে ওঠে, তরল টেনে নেয়, কশেরুকাগুলোর মধ্যে ফাঁক একটু করে বাড়ে। গোটা মেরুদণ্ড জুড়ে এই সামান্য বাড়তিগুলো যোগ হয়ে শরীরের উচ্চতা কিছুটা বেড়ে যায়। নভোচারীদের পোশাক ও আসন বানানোর সময় তাই এই বাড়তি উচ্চতার হিসাবটা মাথায় রাখতে হয়।
পৃথিবীতেও আপনি সকালে একটু লম্বা থাকেন
এই ব্যাপারটা বুঝতে মহাকাশে যাওয়ার দরকার নেই, নিজের শরীরেই পরীক্ষা করে দেখা যায়। সারা রাত শুয়ে থাকার সময় মেরুদণ্ডের ওপর ওজনের চাপ থাকে না, ডিস্কগুলো তখন খানিকটা ফুলে ওঠার সুযোগ পায়। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি যতটা লম্বা, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ঠিক ততটা নন—দিনভর দাঁড়ানো, বসা আর হাঁটাচলার চাপে ডিস্কগুলো আবার চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
পার্থক্যটা খালি চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু মাপলে ধরা পড়ে। যাঁরা সেনাবাহিনী বা এমন কোনো চাকরির উচ্চতার পরীক্ষায় বসেছেন, তাঁদের অনেককেই তাই সকালে মাপ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। মহাকাশে যা ঘটে, সেটি আসলে এই রোজকার ঘটনারই একটা বড় ও দীর্ঘস্থায়ী সংস্করণ—সেখানে চাপটা কয়েক ঘণ্টার জন্য নয়, মাসের পর মাস ধরে অনুপস্থিত থাকে।
ফিরে এলে উচ্চতা আবার আগের মতো হয় কেন
পৃথিবীতে নামার সঙ্গে সঙ্গেই মাধ্যাকর্ষণ আবার তার কাজ শুরু করে দেয়। শরীরের ওজন ফের মেরুদণ্ডের ওপর চাপ দিতে থাকে, ফুলে থাকা ডিস্কগুলো আবার চেপে বসে, আর কয়েক দিনের মধ্যেই উচ্চতা ফিরে যায় আগের জায়গায়। অর্থাৎ মহাকাশে পাওয়া লম্বা হওয়াটা স্থায়ী কোনো অর্জন নয়, সাময়িক ধার নেওয়া মাত্র।
তবে এই ওঠানামার একটা দাম আছে। মেরুদণ্ড দীর্ঘদিন চাপমুক্ত থাকার পর হঠাৎ আবার চাপের নিচে পড়লে পিঠের পেশি ও ডিস্কগুলোকে নতুন করে মানিয়ে নিতে হয়। ফিরে আসার পর অনেক নভোচারীর পিঠে ব্যথা হয়, আর কারও কারও ক্ষেত্রে ডিস্ক সরে যাওয়ার ঝুঁকিও কিছুটা বেড়ে যায় বলে জানা গেছে। তাই মহাকাশ থেকে ফেরার পর তাঁদের ধাপে ধাপে পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
আমাদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। দীর্ঘক্ষণ কুঁজো হয়ে বসে থাকা বা ভুল ভঙ্গিতে ভারী জিনিস তোলা এই ডিস্কগুলোর ওপরই বাড়তি চাপ ফেলে। পিঠে বা কোমরে ব্যথা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তবে নিজে থেকে সিদ্ধান্তে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
শুধু উচ্চতা নয়—মহাকাশে শরীরের আরও যা বদলায়
মাধ্যাকর্ষণ শুধু মেরুদণ্ডকে টানে না, শরীরের রক্ত ও তরলকেও নিচের দিকে টেনে রাখে। সেই টান না থাকায় মহাকাশে তরলের অনেকটা শরীরের ওপরের দিকে উঠে আসে। ফলে নভোচারীদের মুখ ফুলে যায়, আর পা তুলনায় সরু দেখায়। মহাকাশচারীদের মধ্যে এর একটা মজার নামও চালু আছে—ফোলা মুখ আর পাখির ঠ্যাং।
এই তরলের চাপ মাথার দিকে বেড়ে যাওয়ায় চোখের ওপরও প্রভাব পড়ে। দীর্ঘ মিশন শেষে অনেক নভোচারী দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়ার কথা বলেন, কারও কারও ক্ষেত্রে চশমার পাওয়ার বদলে যায়। এটি এখন মহাকাশ চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়, কারণ দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় দৃষ্টির সমস্যা বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় পেশি আর হাড়ের। পৃথিবীতে আমাদের পায়ের ও পিঠের যে পেশিগুলো সারাক্ষণ শরীরকে সোজা ধরে রাখতে খাটছে, মহাকাশে তাদের সেই কাজটাই থাকে না। কাজ না থাকলে পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। হাড়ও একইভাবে ওজনের চাপ না পেলে ক্যালসিয়াম হারাতে শুরু করে, ফলে হাড় পাতলা হয়ে যায় এবং কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকির মতো বাড়তি সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এত কিছুর পরও নভোচারীরা যেভাবে ফিট থাকেন
এই কারণেই মহাকাশ স্টেশনে ব্যায়াম শখ নয়, রীতিমতো দায়িত্ব। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে নভোচারীদের ব্যায়াম করতে হয়, আর সেই ব্যায়ামের যন্ত্রগুলোও পৃথিবীর জিমের মতো নয়। ভরশূন্য অবস্থায় ট্রেডমিলে দৌড়াতে গেলে মানুষ ভেসে যাবে, তাই তাঁদের কোমর ও কাঁধে বেল্ট বেঁধে যন্ত্রের সঙ্গে টেনে আটকে রাখা হয়।
ভার তোলার ব্যায়ামও সেখানে অন্যভাবে করতে হয়, কারণ ভরশূন্য অবস্থায় ডাম্বেলের কোনো ওজনই নেই। তাই এমন যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যেখানে বাধা তৈরি হয় বাতাসের চাপ বা টানের কৌশলে—শরীর পায় ওজন তোলার মতোই একটা প্রতিরোধ। সঙ্গে থাকে হিসাব করে সাজানো খাবার, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিনের জোগান, আর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা।
তবু পৃথিবীতে নামার পর প্রথম কয়েকটা দিন তাঁদের কঠিন সময় যায়। হাঁটতে গেলে পা টলে, ভারসাম্য গোলমাল করে, নিজের শরীরটাকেই অস্বাভাবিক ভারী মনে হয়। ধীরে ধীরে, নিয়মিত ব্যায়াম ও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে শরীর আবার পৃথিবীর নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
শেষ কথা
মহাকাশে লম্বা হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি আসলে একটি বড় সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—আমাদের শরীরের গড়নটাই তৈরি হয়েছে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণকে ধরে নিয়ে। যে টানকে আমরা সারা জীবন গায়েই মাখি না, সেটিই আমাদের মেরুদণ্ডের মাপ, পেশির জোর, হাড়ের ঘনত্ব আর রক্তের বণ্টন ঠিক করে দিচ্ছে। টানটা সরিয়ে নিলেই শরীর অন্যরকম হতে শুরু করে।
মানুষ যদি একদিন চাঁদ বা মঙ্গলে দীর্ঘ সময় থাকতে চায়, তবে এই বদলগুলোকে সামলানোর উপায় খুঁজে বের করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। আর ততদিন পর্যন্ত ব্যাপারটা মনে রাখার সহজ উপায় হলো নিজের শরীরটাই—আজ সকালে আপনি যতটা লম্বা ছিলেন, আজ রাতে ঠিক ততটা নন।
মহাকাশ নিয়ে আপনার মনে কোন প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি ঘোরে? কমেন্টে জানান।
সূত্র: বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা ও বিজ্ঞান সাময়িকীর প্রতিবেদন
প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।



