
ত্বকের যত্নে আমরা অনেক কিছু করি, অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটিই প্রায়ই বাদ পড়ে যায়—সানস্ক্রিন। অনেকে ভাবেন, সানস্ক্রিন শুধু সমুদ্রসৈকতে বা প্রচণ্ড রোদে দরকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি মেঘলা দিনেও থাকে, এমনকি জানালা দিয়েও ত্বকে পৌঁছায়। তাই ত্বক সুস্থ রাখতে চাইলে সানস্ক্রিন প্রতিদিনের সঙ্গী হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের মতো রোদেলা দেশে এর গুরুত্ব আরও বেশি। আসুন জেনে নিই, সানস্ক্রিন আসলে কী করে, কেন প্রতিদিন দরকার আর কীভাবে নিজের জন্য সঠিকটি বেছে নেবেন।
সূর্যের রশ্মি ত্বকের কী ক্ষতি করে
সূর্যের অতিবেগুনি বা ইউভি রশ্মি ত্বকের জন্য নীরব এক শত্রু। এই রশ্মি মূলত দুই ধরনের—ইউভিএ ও ইউভিবি। ইউভিবি রশ্মি ত্বক পুড়িয়ে লালচে করে দেয় ও রোদে পোড়া দাগ ফেলে। আর ইউভিএ রশ্মি ত্বকের গভীরে গিয়ে অকালে বলিরেখা, কালচে ছোপ ও ত্বক ঝুলে পড়ার মতো বার্ধক্যের ছাপ আনে।
দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত রোদ ত্বকের আরও গুরুতর ক্ষতি, এমনকি ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ায়। সানস্ক্রিন এই রশ্মির বড় অংশ ঠেকিয়ে ত্বককে এসব ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
এসপিএফ আসলে কী বোঝায়
সানস্ক্রিনের গায়ে লেখা এসপিএফ (SPF) মানে সান প্রোটেকশন ফ্যাক্টর, যা মূলত ইউভিবি রশ্মি থেকে সুরক্ষার মাত্রা বোঝায়। সংখ্যাটি যত বেশি, সুরক্ষা তত বেশি। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সাধারণত এসপিএফ ৩০ যথেষ্ট, আর বেশি রোদে থাকলে এসপিএফ ৫০ ভালো।
তবে শুধু এসপিএফ দেখলেই হবে না। প্যাকেটে ‘ব্রড স্পেকট্রাম’ লেখা আছে কি না দেখুন—এর মানে সানস্ক্রিনটি ইউভিএ ও ইউভিবি দুটো থেকেই সুরক্ষা দেয়। ইউভিএ সুরক্ষার মাত্রা অনেক সময় ‘PA+’ চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয়, যেখানে যত বেশি ‘+’, তত ভালো সুরক্ষা।
ত্বকের ধরন অনুযায়ী বেছে নিন
সব সানস্ক্রিন সবার ত্বকে মানায় না, তাই নিজের ত্বকের ধরন বুঝে বেছে নেওয়া জরুরি। তৈলাক্ত বা ব্রণপ্রবণ ত্বকের জন্য বেছে নিন হালকা, জেল বা পানিভিত্তিক, ‘নন-কমেডোজেনিক’ লেখা সানস্ক্রিন, যা লোমকূপ বন্ধ করে না।
শুষ্ক ত্বকের জন্য একটু ক্রিমধর্মী, ময়েশ্চারাইজিং সানস্ক্রিন ভালো। স্পর্শকাতর ত্বকে রাসায়নিক উপাদানে জ্বালা হলে জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডভিত্তিক ‘মিনারেল’ সানস্ক্রিন তুলনামূলক নিরাপদ। নতুন পণ্য মুখে দেওয়ার আগে অল্প জায়গায় পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।
সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন তো
ভালো সানস্ক্রিনও ভুলভাবে ব্যবহার করলে কাজে আসে না। বেশিরভাগ মানুষ খুব অল্প পরিমাণে মাখেন, ফলে পুরো সুরক্ষা মেলে না। মুখ ও গলার জন্য অন্তত এক চা-চামচ পরিমাণ সানস্ক্রিন দরকার। ঘর থেকে বের হওয়ার অন্তত ১৫-২০ মিনিট আগে মাখুন, যাতে এটি ত্বকে ঠিকভাবে কাজ শুরু করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি অনেকেই জানেন না—সানস্ক্রিন একবার মাখলেই সারা দিন চলে না। ঘাম, পানি বা সময়ের সঙ্গে এর কার্যকারিতা কমে যায়। তাই বাইরে বেশিক্ষণ থাকলে প্রতি দুই-তিন ঘণ্টা পরপর আবার মাখা দরকার। শুধু মুখ নয়, রোদে উন্মুক্ত গলা, ঘাড় ও হাতেও মাখুন।
কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন, যাঁদের গায়ের রং চাপা, তাঁদের সানস্ক্রিন লাগে না। এটি ভুল—গায়ের রং যেমনই হোক, ইউভি রশ্মির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সবার ত্বকেই হয়। আবার অনেকে ভাবেন, ঘরে থাকলে সানস্ক্রিন অপ্রয়োজনীয়; কিন্তু জানালা দিয়ে আসা ইউভিএ রশ্মি ও ফোন-কম্পিউটারের পাশে দীর্ঘ সময় থাকাও বিবেচনায় রাখা ভালো।
মেঘলা বা বর্ষার দিনেও সূর্যের রশ্মি মেঘ ভেদ করে ত্বকে পৌঁছায়। তাই ঋতু বা আবহাওয়া যাই হোক, দিনের বেলা সানস্ক্রিন মাখার অভ্যাসটি বজায় রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
শেষ কথা
সানস্ক্রিন কোনো বিলাসিতা নয়, ত্বকের যত্নের সবচেয়ে মৌলিক ও কার্যকর ধাপগুলোর একটি। ব্রড স্পেকট্রাম, অন্তত এসপিএফ ৩০, ত্বকের ধরন অনুযায়ী বেছে নেওয়া আর নিয়মিত পুনরায় মাখা—এই কয়েকটি বিষয় মানলেই ত্বক বহু বছর সুস্থ ও তারুণ্যময় থাকে। আজই দৈনন্দিন রুটিনে সানস্ক্রিন যোগ করুন; ভবিষ্যতের ত্বক আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে।
আপনি কি প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন? আপনার পছন্দের ধরন কোনটি, কমেন্টে জানান।