ঘড়ির কাঁটা ডান দিকেই ঘোরে কেন, বাঁ দিকে নয়
ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরে কেন—এটি কি প্রকৃতির নিয়ম, নাকি নিছক একটি অভ্যাস? সূর্যঘড়ির ছায়া থেকে স্ক্রুর প্যাঁচ পর্যন্ত মজার ইতিহাসটি জেনে নিন।
দেয়ালের ঘড়িটার দিকে দিনে কতবার তাকান, তার হিসাব নেই। কাঁটা দুটি সব সময় একই দিকে ঘুরে চলেছে—১২ থেকে ৩, ৩ থেকে ৬, ৬ থেকে ৯। এত স্বাভাবিক একটা ব্যাপার যে প্রশ্নটাই মাথায় আসে না। অথচ প্রশ্নটা বেশ মজার—কাঁটা ঠিক এই দিকেই ঘোরে কেন? উল্টো দিকে ঘুরলে কি এমন ক্ষতি হতো?
অনেকে ভাবেন এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর বৈজ্ঞানিক কারণ আছে, কিংবা পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে এর সম্পর্ক। সত্যিটা আরও কৌতূহলোদ্দীপক। এটি প্রকৃতির কোনো নিয়ম নয়—এটি একটি অভ্যাস, যেটি একেবারেই ভিন্নরকম হতে পারত। শুধু ইতিহাসের কয়েকটি ঘটনা অন্যভাবে ঘটলেই আজ আমাদের ঘড়ি উল্টো দিকে ঘুরত।
দিন মাপার প্রথম যন্ত্রটি ছিল একটুকরো ছায়া
যান্ত্রিক ঘড়ি আসার বহু আগে থেকেই মানুষ সময় মেপেছে। সবচেয়ে সহজ আর সবচেয়ে পুরোনো উপায়টি ছিল ছায়া। মাটিতে একটি কাঠি খাড়া করে পুঁতে দিন, তারপর সারা দিন ধরে তার ছায়া কোথায় পড়ছে সেটি লক্ষ করুন—ব্যস, সময় মাপার যন্ত্র তৈরি। এই সাধারণ ভাবনা থেকেই এসেছে সূর্যঘড়ি, যা পৃথিবীর নানা সভ্যতায় বহু যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়েছে।
সূর্যঘড়ির চেহারা নানা রকম হলেও মূল কথা একটাই—একটি খাড়া অংশ ছায়া ফেলে, আর নিচে বসানো চাকতিতে দাগ কেটে বোঝানো থাকে কখন কোন দাগে ছায়া পড়লে দিনের কোন সময়। মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ছায়ার ঘোরাকে চোখে দেখেছে, আর সময়ের ধারণাটাই তাদের মাথায় গেঁথে গেছে ওই নির্দিষ্ট দিকে ঘোরার সঙ্গে।
উত্তর গোলার্ধে ছায়া যে পথে ঘোরে
এবার আসল জায়গা। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর যে বিশাল অংশ নিরক্ষরেখার উত্তরে, সেখানে দুপুরবেলা সূর্য থাকে দক্ষিণ আকাশের দিকে ঘেঁষে। ফলে দুপুরে ছায়া পড়ে উত্তর দিকে। সকালে সূর্য থাকে পূর্বে, তাই ছায়া পড়ে পশ্চিমে। আর বিকেলে সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লে ছায়া চলে যায় পূর্ব দিকে।
অর্থাৎ দিনভর ছায়ার যাত্রাপথটি হলো—পশ্চিম থেকে উত্তর হয়ে পূর্ব। এখন উত্তর দিকে মুখ করে ছায়াটির দিকে উপর থেকে তাকান। পশ্চিম আপনার বাঁ দিকে, উত্তর সামনে, পূর্ব ডান দিকে। ছায়াটি তাই বাঁ দিক থেকে উপরে উঠে ডান দিকে নেমে যাচ্ছে। ঠিক যেভাবে ঘড়ির কাঁটা ঘোরে।
চাইলে এটি নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। রোদ ওঠা কোনো দিনে উঠানে বা ছাদে একটি লাঠি খাড়া করে পুঁতে দিন। সকাল, দুপুর আর বিকেলে ছায়ার মাথায় একটি করে দাগ দিন। তিনটি দাগ মিলিয়ে দেখবেন, ছায়া ঘড়ির কাঁটার দিকেই সরেছে।
যান্ত্রিক ঘড়ি কেন সেই অভ্যাসই আঁকড়ে ধরল
দম দেওয়া, চাকা-ঘোরা যান্ত্রিক ঘড়ি বড় আকারে তৈরি হতে শুরু করে ইউরোপে—গির্জার চূড়ায়, শহরের টাওয়ারে। আর ইউরোপ পুরোটাই উত্তর গোলার্ধে। ঘড়ি বানানোর কারিগরদের সামনে যে দর্শকেরা ছিলেন, তাঁরা আজীবন সূর্যঘড়ির ছায়াকে ওই একটি দিকেই ঘুরতে দেখে এসেছেন।
তাই নতুন যন্ত্রের কাঁটা যদি উল্টো দিকে ঘুরত, সাধারণ মানুষের কাছে সেটি ভুল ও বিভ্রান্তিকর মনে হতো। প্রযুক্তি নতুন হলেও অভ্যাসটা পুরোনো রাখাই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। এভাবেই ছায়ার ঘোরার দিকটি সোজা চলে এল ধাতুর কাঁটায়।
ইতিহাসে ব্যতিক্রম যে ছিল না তা নয়। পুরোনো কিছু ঘড়িতে ডায়াল সাজানো হয়েছিল অন্যরকমভাবে, কোথাও চব্বিশ ঘণ্টার হিসাব, কোথাও কাঁটার ঘোরাও উল্টো। কিন্তু সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। যে নকশা বেশি মানুষ চিনত, বাজারে টিকে গেল সেটিই। প্রতিযোগিতাটা নিখুঁত হওয়ার ছিল না, চেনা হওয়ার ছিল।
দক্ষিণ গোলার্ধে দাঁড়ালে হিসাবটা উল্টে যায়
এখানেই সবচেয়ে মজার কথাটি। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা বা আর্জেন্টিনার মতো দক্ষিণ গোলার্ধের দেশে দুপুরের সূর্য থাকে উত্তর আকাশের দিকে। ফলে দুপুরে ছায়া পড়ে দক্ষিণে। সকালে ছায়া পশ্চিমে, বিকেলে পূর্বে—এটুকু একই থাকে, কিন্তু মাঝখানের পথটা ঘুরে যায় উল্টো দিকে।
সেখানকার সূর্যঘড়ির ছায়া তাই ঘোরে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে। অর্থাৎ যান্ত্রিক ঘড়ির আবিষ্কার যদি দক্ষিণ গোলার্ধের কোনো সভ্যতায় শুরু হতো, আজ গোটা পৃথিবীর ঘড়ি সম্ভবত বাঁ দিকেই ঘুরত, আর সেটিকেই আমরা “স্বাভাবিক” বলতাম।
তাহলে দাঁড়াল এই—ঘড়ির কাঁটার দিকটি প্রকৃতির কোনো নিয়ম নয়। এটি নিছক একটি ঐতিহাসিক ঘটনাচক্র, যেটি ভূগোলের কারণে একদিকে গড়িয়ে গেছে।
এই অভ্যাস যেভাবে স্ক্রু থেকে কল—সবকিছুর মান হয়ে গেল
ঘড়ি এতটাই দৈনন্দিন জিনিস হয়ে উঠল যে তার ঘোরার দিকটি ভাষার ভেতরে ঢুকে গেল। ইংরেজিতে ডান দিকে ঘোরাকেই বলা হতে লাগল “clockwise”, আর উল্টোটাকে “anticlockwise”। ঘোরার দিক বোঝাতে আলাদা কোনো শব্দ আর লাগল না—ঘড়িই হয়ে গেল মাপকাঠি।
এরপর সেই মাপকাঠি ছড়িয়ে পড়ল যন্ত্রপাতিতে। বেশির ভাগ স্ক্রু আর বল্টুর প্যাঁচ এমনভাবে কাটা, যাতে ডান দিকে ঘোরালে আঁটে আর বাঁ দিকে ঘোরালে খোলে। বোতলের ছিপি, জারের ঢাকনা, পানির কল, গ্যাসের চুলার নব, ফ্যানের রেগুলেটর, সাউন্ড সিস্টেমের ভলিউম—সবখানে একই ইঙ্গিত। ডান দিকে মানে আঁটা, বাড়ানো, চালু করা।
এই একরূপতার একটা বড় সুবিধা আছে। অচেনা কোনো যন্ত্রের সামনে দাঁড়ালেও হাত আপনাআপনি ঠিক দিকে মোচড় দেয়, ভাবতে হয় না। কারখানায় যন্ত্রাংশ বানানো সহজ হয়, একজনের বানানো স্ক্রু আরেকজনের যন্ত্রে খাটে। ছোট্ট একটি অভ্যাস এভাবেই গোটা দুনিয়ার একটি নীরব মান হয়ে গেছে।
তবু কিছু জায়গায় উল্টো নিয়মই টিকে আছে
সব জায়গায় অবশ্য ডান দিকের রাজত্ব চলে না। অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাকে দৌড়বিদেরা ঘোরেন ঘড়ির উল্টো দিকে—মাঠের এই রীতিটি বহু বছর ধরে চলে আসছে। গণিতেও কোণ মাপা হয় ঘড়ির বিপরীত দিকে ঘুরে, তাই ছাত্রজীবনে জ্যামিতির খাতায় আমরা উল্টো দিকেই কোণ এঁকেছি।
যন্ত্রপাতিতেও ইচ্ছাকৃত ব্যতিক্রম রাখা হয়। কিছু গ্যাস-সংযোগে উল্টো প্যাঁচ কাটা থাকে, যাতে ভুল পাইপে ভুল জিনিস লাগিয়ে ফেলা না যায়। সাইকেলের বাঁ দিকের প্যাডেলেও উল্টো প্যাঁচ দেওয়া হয়, নইলে চালানোর সময় সেটি নিজে নিজেই আলগা হয়ে যেত। অর্থাৎ যেখানে নিরাপত্তা বা যান্ত্রিক প্রয়োজন বেশি জরুরি, সেখানে অভ্যাসকে সরিয়ে যুক্তিই জায়গা নেয়।
শেষ কথা
ঘড়ির কাঁটার দিকটি নিয়ে ভাবতে বসলে ছোট্ট একটি সত্য সামনে চলে আসে—আমরা যেসব জিনিসকে “স্বাভাবিক” বা “সব সময়ের নিয়ম” ভাবি, তার অনেকগুলোই আসলে বহু বছরের অভ্যাস, প্রকৃতির বাঁধা নিয়ম নয়। একদল মানুষ পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট অংশে দাঁড়িয়ে ছায়ার দিকে তাকিয়েছিলেন, আর সেই দেখাটাই আজও আমাদের কবজিতে ঘুরছে।
পরের বার দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালে একবার ভেবে দেখবেন—ওই ছোট্ট কাঁটাটি আসলে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো একটি ছায়ার পথ ধরে হাঁটছে। এবং সেই ছায়াটি পড়েছিল আমাদেরই গোলার্ধে।
এমন আর কোন চেনা অভ্যাসের পেছনের ইতিহাস জানতে চান? কমেন্টে লিখুন।
সূত্র: বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসবিষয়ক প্রতিবেদন
প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।



