ফ্রিজে রাখলে যে ৮টি খাবার বরং দ্রুত নষ্ট হয়
ফ্রিজে রাখা খাবার মানেই নিরাপদ নয়—আলু, টমেটো, পেঁয়াজসহ কিছু খাবার ঠান্ডায় বরং দ্রুত স্বাদ ও গুণ হারায়। জেনে নিন কোনটি কোথায় রাখা ভালো।
বাজার থেকে ফিরে ব্যাগ খুলেই আমরা অনেকে একটা কাজ করি—যা কিছু নরম, রসালো বা তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে মনে হয়, সব ঢুকিয়ে দিই ফ্রিজে। মনে হয়, ঠান্ডায় থাকলে আর ভাবনা নেই। কিন্তু রান্নাঘরের বাস্তবতা একটু অন্যরকম। ফ্রিজ সব খাবারের বন্ধু নয়; কিছু খাবারের ক্ষেত্রে ঠান্ডা উল্টো কাজ করে—স্বাদ ফিকে হয়ে যায়, গঠন বদলে যায়, কোনোটা আবার বাইরে রাখলে যত দিন টিকত, ফ্রিজে তার চেয়ে কম দিনেই খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে।
কারণটা কঠিন কিছু নয়। ফ্রিজের ঠান্ডা জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ধীর করে ঠিকই, কিন্তু ফল আর সবজি তো নিছক জড় বস্তু নয়—গাছ থেকে ছেঁড়ার পরও তাদের ভেতরে নানা প্রক্রিয়া চলতে থাকে। গ্রীষ্মমণ্ডলের অনেক ফল-সবজি জন্মগতভাবেই ঠান্ডা সইতে পারে না; বেশি ঠান্ডায় তাদের কোষের গঠন ভেঙে যায় আর স্বাদ-ঘ্রাণের উপাদানগুলো নষ্ট হয়। নিচে এমন আটটি খাবারের কথা বলা হলো, যেগুলো সাধারণত ফ্রিজের বাইরেই ভালো থাকে—সঙ্গে কিছু সৎ ব্যতিক্রমও, কারণ বাংলাদেশের গরমে সব নিয়ম হুবহু খাটে না।
ঠান্ডায় যে সবজিগুলোর স্বাদ বদলে যায়
১. আলু। ফ্রিজের ঠান্ডায় আলুর ভেতরের স্টার্চ ধীরে ধীরে চিনিতে বদলে যেতে থাকে। ফলে আলু খেতে অদ্ভুত মিষ্টি লাগে, আর ভাজতে গেলে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি কালচে-বাদামি হয়ে যায়। আলু রাখুন ঘরের ভেতরে অন্ধকার, ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায়—ঝুড়িতে বা চটের ব্যাগে, প্লাস্টিকের মোড়কে নয়।
২. পেঁয়াজ ও রসুন। এদের শত্রু ঠান্ডা নয়, আর্দ্রতা। ফ্রিজের ভেতরের ভেজা বাতাস পেঁয়াজের খোসা নরম করে দেয়, ভেতরটা পিচ্ছিল হয়ে পচন ধরে; রসুনের কোয়া রবারের মতো হয়ে যায় বা তাড়াতাড়ি অঙ্কুর গজায়। খোলা ঝুড়িতে, শুকনো ও ছায়াময় জায়গায় রাখুন—তবে পেঁয়াজ আর আলু পাশাপাশি নয়, তাতে দুটোই দ্রুত নষ্ট হয়।
৩. টমেটো। টমেটোর গায়ের নিচে যে রসালো কোষগুলো থাকে, বেশি ঠান্ডায় সেগুলোর দেয়াল ভেঙে যায়। ফলে বাইরে থেকে দেখতে ঠিক থাকলেও কামড় দিলে ভেতরটা লাগে ময়দার মতো ভেজা-গুঁড়ো, আর টমেটোর নিজস্ব ঘ্রাণটাই উধাও হয়ে যায়। কাঁচা বা আধপাকা টমেটো ঘরের তাপমাত্রায় রাখুন, বোঁটার দিক নিচে দিয়ে, একটার গায়ে আরেকটা চেপে নয়।
যে ফল ঠান্ডায় পাকতেই ভুলে যায়
৪. কলা। ফ্রিজে রাখলে কলার খোসা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কালো হয়ে যায়—ঠান্ডায় খোসার কোষ নষ্ট হওয়ার ফল। এতে ভেতরের শাঁস সব সময় খারাপ হয়ে যায় না ঠিকই, কিন্তু পাকার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটা এলোমেলো হয়ে যায় বলে স্বাদ আর আগের মতো থাকে না। কলা ঝুলিয়ে রাখুন, আর অন্য ফলের সঙ্গে গাদাগাদি করে নয়—কলা থেকে বেরোনো গ্যাস পাশের ফলকেও তাড়াতাড়ি পাকিয়ে দেয়।
৫. কাঁচা আম ও না-পাকা ফল। আম, পেঁপে, আনারস, অ্যাভোকাডোর মতো ফল গাছ থেকে পাড়ার পরও পাকতে থাকে। কাঁচা অবস্থায় ফ্রিজে ঢোকালে সেই পাকার প্রক্রিয়া থেমে যায়, আর পরে বের করলেও ফলটি আর ঠিকমতো পাকে না—ভেতরটা শক্ত, বিস্বাদ আর কষা থেকে যায়। পাকার আগপর্যন্ত ঘরের তাপমাত্রায় রাখুন; ভালোভাবে পেকে যাওয়ার পর কয়েক দিন ফ্রিজে রাখতে পারেন।
যেগুলো ফ্রিজে রাখার দরকারই পড়ে না
৬. মধু। মধু এমনিতেই প্রকৃতির অন্যতম টেকসই খাবার; ঠিকমতো ঢাকনা আটকে রাখলে ঘরের তাপমাত্রাতেই বহুদিন ভালো থাকে। ফ্রিজে রাখলে বরং তাড়াতাড়ি জমে দানা দানা হয়ে যায়, চামচ ঢোকানোই কঠিন হয়ে পড়ে। রান্নাঘরের তাকে, রোদ থেকে দূরে, শুকনো চামচ ব্যবহার করে রাখলেই যথেষ্ট।
৭. পাউরুটি। এটি অনেকের কাছেই অবাক করা তথ্য—ফ্রিজের ঠান্ডায় পাউরুটি ঘরের তাপমাত্রার চেয়ে দ্রুত বাসি ও শক্ত হয়ে যায়। ঠান্ডায় রুটির স্টার্চ দ্রুত পানি ছেড়ে জমাট বাঁধে, তাই মুখে লাগে শুকনো ও ঝুরঝুরে। দু-তিন দিনে শেষ হবে এমন পাউরুটি বাতাস না ঢোকা প্যাকেটে ঘরেই রাখুন; আর অনেক দিন রাখতে চাইলে নরমাল চেম্বার নয়, একেবারে ডিপ ফ্রিজে রাখুন—ডিপে রাখলে গুণ অনেকটাই ধরে থাকে।
নরম পাতা যেভাবে রাখলে বেশি দিন টেকে
৮. তুলসী ও নরম পাতার মসলা। তুলসী বা বেসিল-জাতীয় পাতা ঠান্ডা একেবারেই সইতে পারে না—ফ্রিজে ঢোকানোর পরদিনই পাতা কালচে হয়ে নেতিয়ে পড়ে। এ ধরনের ডাঁটাসহ পাতা এক গ্লাস পানিতে ফুলের তোড়ার মতো দাঁড় করিয়ে রান্নাঘরেই রাখুন। ধনেপাতা অবশ্য ঠান্ডা কিছুটা সইতে পারে, কিন্তু পলিথিনে ভরে খোলা তাকে ছুড়ে রাখলে সেটিও দু-এক দিনেই হলুদ হয়ে যায়—শিকড়সহ পানির গ্লাসে রেখে ওপরটা হালকা ঢেকে দিলে অনেক বেশি দিন সতেজ থাকে।
বাংলাদেশের গরমে যেখানে নিয়মটা খাটে না
উপরের কথাগুলো লেখা হয়েছে মোটামুটি নাতিশীতোষ্ণ ঘরের কথা ভেবে। কিন্তু আমাদের এখানে গ্রীষ্মে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা যা দাঁড়ায়, আর বর্ষায় বাতাসে যে পরিমাণ আর্দ্রতা থাকে, তাতে “ঘরের তাপমাত্রা” কথাটার অর্থই বদলে যায়। ভ্যাপসা গরমে পাউরুটি বাইরে রাখলে বাসি হওয়ার আগেই ছত্রাক পড়ে যেতে পারে—তখন একটু শক্ত রুটি খাওয়া নষ্ট রুটি ফেলে দেওয়ার চেয়ে ভালো। একইভাবে টমেটো বা পাকা আম ঘরে রাখলে যদি এক দিনেই নরম হয়ে যায়, তাহলে ফ্রিজে রাখাটাই বাস্তবসম্মত।
মূল কথাটা তাই নিয়ম নয়, বিচারবুদ্ধি। যেটুকু দু-তিন দিনে খেয়ে ফেলবেন, সেটুকু বাইরে রাখুন—তাতে স্বাদ সবচেয়ে ভালো থাকবে। যেটুকু বেশি দিন রাখতে হবে, বা যেটুকু কেটে ফেলা হয়েছে, সেটা নির্দ্বিধায় ফ্রিজে দিন। কাটা যেকোনো ফল বা সবজি এই আলোচনার বাইরে—কাটার পর সেগুলো ফ্রিজেই রাখা উচিত, ঢাকনা দেওয়া বাটিতে।
আরেকটি ছোট অভ্যাস অনেক অপচয় ঠেকায়—একবারে বেশি করে কিনে ফেলার বদলে পরিমাণমতো কেনা। বাজারের ব্যাগ ভর্তি করে এনে ফ্রিজে ঠেসে রাখলে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস ঠিকমতো চলাচল করতে পারে না, ফলে সবকিছুই একটু একটু করে খারাপ হতে থাকে।
শেষ কথা
ফ্রিজ দারুণ কাজের যন্ত্র, কিন্তু এটি জাদুর বাক্স নয়। কোন খাবার কোথায় থাকতে ভালোবাসে—এই সামান্য জ্ঞানটুকু থাকলে মাসের শেষে বাজারের খরচ যেমন কমে, তেমনি ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া খাবারের পরিমাণও কমে আসে। আজই একবার ফ্রিজটা খুলে দেখুন, ভেতরে এমন কিছু আছে কি না যেটির আসল জায়গা রান্নাঘরের তাকে।
আর মনে রাখবেন, চোখ আর নাকের বিচারই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। গন্ধ বদলে গেলে, পিচ্ছিল হয়ে গেলে বা ছত্রাক পড়লে সেটি কোথায় রাখা ছিল তা আর ভেবে লাভ নেই—ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
আপনার রান্নাঘরে কোন জিনিসটা ফ্রিজে রাখেন, যেটি নিয়ে সবসময় দ্বিধায় থাকেন? কমেন্টে লিখুন।
সূত্র: বিভিন্ন খাদ্যবিজ্ঞান ও কৃষি সম্প্রসারণ বিষয়ক প্রতিবেদন
প্রতিদিনের চারপাশের কৌতূহল আর প্রকৃতির রহস্য সহজ বাংলায় তুলে ধরাই আমাদের কাজ। নতুন কিছু জানতে সঙ্গে থাকুন।



